শকুন্তলা (আদি ব্রাহ্মসমাজ সংস্করণ)/শকুন্তলা

উইকিসংকলন থেকে
Jump to navigation Jump to search



শকুন্তলা ।


 এক নিবিড় অরণ্য ছিল। তা’তে ছিল বড় বড় বট, সারি সারি তাল তমাল, পাহাড় পর্ব্বত, আর ছিল—ছোট নদী মালিনী।

 মালিনীর জল বড়ো স্থির, আয়নার মত; তা’তে গাছের ছায়া, নীল আকাশের ছায়া, রাঙা মেঘের ছায়া, উড়ন্ত পাখীর ছায়া—সকলি দেখা যে’ত। আর দেখা যে’ত গাছের তলায় কতগুলি কুটিরের ছায়া।

 নদীতীরে যে নিবিড় বন ছিল তা’তে অনেক জীব জন্তু ছিল। কত হাঁস, কত বক, সারাদিন খালের ধারে বিলের জলে ঘুরে বেড়াত। কত ছোট ছোট পাখী, কত টীয়াপাখীর ঝাঁক গাছের ডালে ডালে গান গাইত, কোটরে কোটরে বাসা বাঁধত। দলে দলে হরিণ, ছোট ছোট হরিণ-শিশু, কুশের বনে, ধানের ক্ষেতে, কচি ঘাসের মাঠে খেলা করত। বসন্তে কোকিল গাইত, বর্ষায় ময়ূর নাচত।

 এই বনে তিন হাজার বৎসরের এক প্রকাণ্ড বটগাছের তলায় মহর্ষি কণ্বদেবের আশ্রম ছিল। সেই আশ্রমে জটাধারী তপন্বী কণ্ব আর মা-গৌতমী ছিলেন, তাঁদের পাতার কুটির ছিল,পরনে বাকল ছিল,গোয়াল-ভরা গাই ছিল, চঞ্চল বাছুর ছিল, আর ছিল বাকল-পরা কত্কগুলি ঋষিকুমার।

 তা’রা কণ্বদেবের কাছে বেদ পড়ত, মালিনীর জলে তর্পণ করত, গাছের ফলে অতিথিসেবা করত, বনের ফুলে দেবতার অঞ্জলি দিত। আর কী করত?—বনে বনে হোমের কাঠ কুড়িয়ে বেড়াত, কালো গাই ধ’লো গাই মাঠে চরাতে যে’ত। সবুজ মাঠ ছিল তা’তে গাই বাছুর চরে বেড়াত, বনে ছায়া ছিল তা’তে রাখাল-ঋষিরা খেলে বেড়াত। তা’দের ঘর গড়বার বালি ছিল, ময়ূর গড়বার মাটী ছিল, বেণুবাঁশের বাঁশী ছিল, বটপাতার ভেলা ছিল; আর ছিল—খেলবার সাথী বনের হরিণ, গাছের ময়ূর; আর ছিল—মা-গৌতমীর মুখে দেবদানবের যুদ্ধকথা, তাত কণ্বের মুখে মধুর সামবেদ গান।

 সকলি ছিল, ছিল না কেবল—আঁধার ঘরের মাণিক—ছোট মেয়ে—শকুন্তলা। একদিন নিসুতি রাতে আপ্সরী মেনকা তা’র রূপের ডালি—দুধের বাছা—শকুন্তলা মেয়েকে সেই তপোবনে ফেলে রেখে গেল। বনের পাখীরা তা’কে ডানায় ঢেকে বুকে নিয়ে সারা রাত বসে রইল।

 বনের পাখীদেরও দয়ামায়া আছে কিন্তু সেই মেনকা পাষাণীর কি কিছু দয়া হ’ল!

 খুব ভোর বেলায় তপোবনের যত ঋষি-কুমার বনে বনে ফল ফুল কুড়তে গিয়েছিল। তা’রা আমলকীর বনে আমলকী, হরীতকীর বনে হরীতকী, ইংলী ফলের বনে ইংলী কুড়িয়ে নিলে; তার পরে ফুলের বনে পূজার ফুল তুল্‌তে তুল্‌তে পাখীদের মাঝে ফুলের মত সুন্দর শকুন্তলা মেয়েকে কুড়িয়ে পেলে। সবাই মিলে তা’কে কোলে করে তাত কণ্বের কাছে নিয়ে এল। তখন সেই সঙ্গে বনের কত পাখী, কত হরিণ, সেই তপোবনে এসে বাসা বাঁধলে। শকুন্তলা সেই তপোবনে, সেই বটের ছায়ায় পাতার কুটীরে, মা-গৌতমীর কোলে-পিঠে মানুষ হতে লাগল। তার পর শকুন্তলার যখন বয়স হ’ল তখন তাত কণ্ব পৃথিবী খুঁজে শকুন্তলার বর আনতে চলে গেলেন। শকুন্তলার হাতে তপোবনের ভার দিয়ে গেলেন।

 শকুন্তলার আপনার মা-বাপ তা’কে পর করলে, কিন্তু যা’রা পর ছিল তা’রা তা’র আপনার, হল। তাতঃ কণ্ব তা’র আপনার, মা-গৌতমী তা’র আপনার, ঋষিবালকেরা তা’র আপনার ভায়ের মতো, গোয়ালের গাই বাছুর—সেও তা’র আপনার, এমন কি—বনের লতাপাতা তা’রাও তা’র আপনার ছিল। আর ছিল—তা’র বড়ই আপনার দুই প্রিয়সখী—অনসূয়া, প্রিয়ম্বদা; আর ছিল একঢি মা-হারা হরিণ-শিশু—বড়ই ছোট—বড়ই চঞ্চল।

 তিন সখীর আজকাল অনেক কাজ, ঘরের কাজ, অতিথি সেবার কাজ, সকালে সন্ধ্যায় গাছে জল দেবার কাজ, সহকারে মল্লিকা লতার বিয়ে দেবার কাজ; আর শকুন্তলার দুই সখীর আর একটি কাজ ছিল—তা’রা প্রতিদিন মাধবী-লতায় জল দিত আর ভাব্‌ত, কবে ওই মাধবীলতায় ফুল ফুটবে, সেই দিন সখী শকুন্তলার বর আস্‌বে।

 এ ছাড়া আর কি কাজ ছিল?—হরিণ-শিশুর মত নির্ভয়ে এ-বনে সে-বনে খেলা করা, ভ্রমরের মত লতা-বিতানে গুণ গুণ গল্প করা, নয়তো মরালীর মতো মালিনীর হিম জলে গা ভাসান; আর প্রতিদিন সন্ধ্যার আঁধারে বনপথে বনদেবীর মত তিন সখীতে ঘরে ফিরে আসা,—এই কাজ।

 একদিন দক্ষিণ বাতাসে সেই কুসুমবনে দেখতে দেখতে প্রিয় মাধবীলতার সর্ব্বাঙ্গ ফুলে ভরে উঠল। আজ সখীর বর আসবে বলে চঞ্চল হরিণীর মতো চঞ্চল অনসূয়া প্রিয়ম্বদা আরো চঞ্চল হ’য়ে উঠল।