শ্মশানের ফুল/প্রতিধ্বনি

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


প্রতিধ্বনি।

 

মুখ দেখে যারা, দেখেনা অন্তর তারা,
অনভিজ্ঞ-হৃদয়-বেদনা।
তৃষায় শুষিয়া ফেলে নয়নের ধারা,
বিষাদের বিষম যাতনা।
মুখ চিনি যার চিনিনা হৃদয় তার
জানিনাকো চরিত্র কেমন।
কিরূপে বলিব আমি কিবা আছে কার
অন্তরেতে নিহিত গোপন?
অপূর্ণ কামনা কারো আত্মঘাতী হয়
নিরাশার দক্ষিণ মশানে;

কত চিতা জ্বলে, কত জ্বলে নিবে যায়
জীবনের জ্বলন্ত শ্মশানে।
উল্লাসে উৎফুল্ল কারো হৃদয়ের দল
অভিনব অনুরাগ বশে।
কাহারো শুকায় সদ্য প্রণয়-কমল
হৃদয়ের মানস সরসে।
হেথা কত কেহ আসে কত কেহ যায়,
ব্যস্ত সবে কাযে আপনার।
চরণের ধারে যেই ধরণী লুটায়
সেধারে চাহেনা একবার।
কত কেহ ঢাকি মুখ দূরে যায় সরে
জীবনের উদ্দেশ্য বিফল।
নাহি কি একটী প্রাণ ব্যথিতের তরে
ঝরে যার ফোঁটা দুই জল।
কেহবা নিকটে আসি সান্ত্বনার ছলে
ঘৃণা ভরে দু’টো কথা কয়।
কেহ বা চলিয়া যায় দলি পদতলে
নিরাশায় বিষন্ন-হৃদয়।
দেহ জর্জ্জরিত, মন বিষাদে মগন
উপেক্ষার কটাক্ষের বাণে।
কারে দেখাইব করি হৃদি উন্মোচন।
যে অনল পুষিয়াছি প্রাণে?

কেন মানবেরে? নাহি অন্য এ ধরায়
কেহ? ধরা কি মানবময়?
আছে রবি শশী তারা গগনের গায়
আছে বনে বিহগ নিচয়।
তারা জানে দহিছে জীবন কি আগুণে—
তারা জানে হৃদয়ের ক্লেশ—;
জানিয়া না জানে নর শুনিয়া না শুনে
দুঃখ তার পরশে না কেশ।
ডাকিলে না দেয় সাড়া নিজ কাযে ধায়
নিজ দুঃখে কাতর পাগল;
পরের ঝরিলে অশ্রু উপেক্ষায় চায়
দুঃখ তার ভাণ অবিরল।
চাহিনা মানব আমি চাহিনা আদর
বনের বানর যদি হয়
সেও ভালো, দণ্ড দুই মিশায়ে অন্তর
মরমের কথা যদি কয়।
জানি আমি মানব যে পৃথিবীর সার
তার তরে এ বিশ্ব জগৎ!
তারি তরে হেথা প্রণয়ের অবতার
কিন্তু তার ব্যভার অসৎ।
নন্দনের কল্পতরু মায়া দেবতার
প্রণয় সে কণ্টকিত ফুল;

কাঁটা তার কনকের, পাতা মুকুতার
অজগর-বিজড়িত মূল।
স্বরগের শাপভ্রষ্ট দেবের সঙ্গীত
আনুরাগ অমর ধরায়।
যাহার জীবনে পশে সে হয় মোহিত
স্বরগ সে মরতেতে পায়।
প্রণয়ের রঙ্গভূমি স্থান তপস্যার,
যৌবন সে দেহের মন্দির,
জীবনের লীলাগায় কীত্তি বিধাতার
যেথা শশী অনন্ত মিহির।
প্রণয়ের অনুরাগ যৌবন জীবনে
সৌন্দর্য্য সে বিধাতার লীলা,
চির-পূর্ণিমার চাঁদ শারদ গগনে
জাহ্নবী সে পবিত্র-সলিলা,
এ সৌন্দর্য্য নাহি সার খালি তার বুক
প্রাণ তার ভ্রম বিপর্য্যয়,
বসন্ত ঊষায় দেখে সায়াহ্নের মুখ
সে জীবন ঝড় বজ্রময়।
শুনে যা বিহগ! মোর মরমের গান
দেখে যারে হৃদয়ের চিন।
গাও উড়ে কাননের সরল পরাণ
এ জীবন সঙ্গিনী-বিহীন।

মানবের কাণে যেন পশেনা এ স্বর
তাদের যে পরাণে পাষাণ—;
কে জানে গলাবে কিনা তাদের অন্তর
এ আমার বিষাদের গান।
খেলুক সে প্রতিধ্বনি গগনে গগনে
রবি তারায় তারায়—;
হোক বার্ত্তা বিষাদের গহন কাননে
প্রতিহত ঊষায় সন্ধ্যায়।

-:০:-