শ্মশানের ফুল/কণ্ঠহার

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


কণ্ঠহার।

আয়রে বিষাদ! জীবনের নিঠুরা সঙ্গিণি!
মরণের অন্ধকারে আবরিয়া তনুখানি,
শ্মশানের ভস্মরাশি—মানবের ছিন্ন আশা—
দগ্ধ-হৃদয়ের অশ্রু,—নষ্ট-স্নেহ ভালবাসা,
প্রণয়ের পরিণাম—শক্রতার অবসান
মাখি অঙ্গে আয় শোক! শুনিতে আপন গান
ডেকে আন্‌ অশ্রুনীরে তোর প্রিয় সহচরে
অঙ্কিত কপোলে আর অবসন্ন কলেবরে।
আয় শোক সহচরি! আয় তোর গলা ধরি
বারেক কাঁদিগো আয় তোর তরে প্রাণেশ্বরি!

যাবেনা যাবেনা বৃথা প্রিয়ে! প্রণয় তোমার,
যাবেনাকো বিফলে—বিদায় তোমার আমার,
প্রণয়ের বিদায়োপহার—ফোঁটা দুই জল—
নিতান্তই তব তরে ঝরিবেক নিরমল।
অশ্রুসিক্ত মৃত্তিকাতে অঙ্কুরিবে যে মুকুল
জন্মিবে নূতন তরু ধরিবে নির্ম্মল ফুল।
যে কেহ আসিবে হেথা লভিবে সুরভি বায়
শোকের বিরাম হবে ইহার শীতল ছায়।
জুড়াইবে কুসুমের নির্ম্মল মাধুরি হেরি
সন্তপ্ত পথিক যারা থাকিবে ইহারে ঘেরি।
কত ফুল আছে সাহিত্যের বিষাদ উদ্যানে
কত বিষাদিত প্রাণ—বিরাজিছে এইখানে;
ক’জনা তাদের পানে চেয়ে দেখে মুখ তুলে
ক’জনা তাদের হেরি আত্মহারা হয় ভুলে।
বিরলে হেরিব আমি বিরলে লভিব সুখ
লোকমাঝে লোকলাজে ঢাকিয়া রাখিব মুখ।
হৃদয় কাঁদিলে পরে চাহিব তোমার পানে
বিষাদের ফুল তুমি তুষিবে বিষাদ গানে
যদি কেহ আসি হেথা চাহে উপেক্ষার ভরে
এ সুন্দর ফুল মম নহেগা তাদের তরে।
উপেক্ষার বিষবাণ হেরিলে ঝরিয়া যায়
তাহাদের আঁখি যেন নাহি এর পানে চায়।

উপহাসে কাজ নাই থাকুক ওখানে উটি
শ্মশানের ফুল ওযে—শ্মশানে থাকিবে ফুটি।
যৌবনের সম্ভাষণে—হর্ষবিষ্ফারিত মনে
রোপেছিনু দু’জনায়, যে সাধের কুঞ্জবনে
সাধের কুসুম তরু, প্রেমের বিলাসাগার
বিনামেঘে বজ্রপাতে হয়েছে বিনাশ তার।
ফুটেনা কুসুম আর ছুটেনা সুবাস তার,
গাহেনা বিহগ গান বিলুন্ঠিত রত্নাগার।
না বহে মলয়ানিল, না পশে কৌমুদিকর,
কুঞ্জবন মরুভূমি—নিরালয় ভয়ঙ্কর।
ঝরিয়া গিয়াছে পাতা, শুকায়ে গিয়াছে লতা
তরু নাহি দেয় ছায়া হইয়াছে বজ্রাহতা,
কেবল সে শুষ্কলতা তরুরে জড়ায়ে আছে
তরু না ফেলায় টানি ছিন্ন হয়ে যায় পাছে,
কে জানে কাহার ভরে দাঁড়াইয়া আছে তারা
ছিঁড়িলে বল্লরী যদি তরুবর হয় সারা!
কাজ কি ছিঁড়িয়া তারে থাকুক সে ঐখানে
আজীবন তরু তারে রাখুক আপন প্রাণে।
এস হে বিষাদ! সৌভাগ্যের অনন্ত বিদায়
কামনার বিসর্জ্জন দাও জ্বলন্ত চিতায়।
থেকো কাছে আশে পাশে জীবনের সহচরি!
স্খলিত চরণ হ’লে উঠাইও হাত ধরি।

করিয়াছি আবাহন—করো’ এই বরদান
বল্লরীর প্রেম যেন ভুলেনা তরুর প্রাণ,
সময়ের আবরণ করিবারে বিমোচন
একমাত্র অবলম্ব তুমি; খসিবে যখন
ব্রততীর প্রেম-আলিঙ্গন তরু দেহ হ’তে
সময়ের তাড়নায়, জাগাইয়া বিধিমতে
পরিচিত স্মৃতি, উত্তেজিত করিয়া বিষাদে,
‘শোকারি’ কালের নাম ঘুচাইবে অবিবাদে।
বাঁধিও যতনে যেন না হয় স্খলিত চ্যূত
যাবত না হয় তরু দাবদ ভস্মীভূত।
আগে যদি জানিতাম—সংসারের এত জ্বালা
তা’হলে কি পরিতাম প্রেম সঞ্জীবনী-মালা।
প্রণয়-কলিকা গুলি একে একে তুলিতাম
ধীরে ধীরে খরস্রোতে সিন্ধুনীরে ঢালিতাম।
দেখিতাম যাবত না আঁখি অন্ধকার পার
অনুরাগ অশ্রুবারি ঢালিতাম অনিবার।
কে আর স্বেচ্ছায় বল নিগড় পড়িতে চায়?
কোমল কুসুম হার কে আর ঠেলিবে পায়?
জীবনের ঊষার আলোকে, ভাতিত যখন
দূরে, যৌবনের ছায়া, ক্ষীণা রেখার মতন
আধ আলো-অন্ধকারে, কি স্বপনে জাগরণে,
দেখিতাম সে সৌন্দর্য্যোচ্ছাস, বিমোহিত মনে।

সীমা হ’তে সীমান্তর দীপ্ত যার হেমাভায়,
ভূলোক দ্যুলোক মাঝে নাহি তার তুলনায়।
আলেয়ার প্রতারণে ভুলে যথা পথিকেরা
যায় দিগন্তরে, কিম্বা ভ্রান্ত নাবিকেরা
সাগর কন্দরে, পড়ি জালে মৃগ-তৃষিকায়
কাঁদে যথা মৃগশিশু মরুভূমে পিপাসায়
কিম্বা জুড়াইবে বলি, পশে পতঙ্গ অনলে
অথবা অয়স ধায় দূর অয়স্কান্ত বলে।
তেমতি রূপের তৃষা প্রেমের বিলাস হাসি,
প্রণয়ের ধ্রুব তারা, আকর্ষিল, হেথা আসি।
কে জানে কেমন শক্তি প্রেমের মোহন বলে,
হেনকালে অলক্ষিতে জড়াইয়া দিল গলে
সুবর্ণ কুসুমদাম অনাঘ্রাত পরিমল;
স্বর্গীয় কৌমুদীময় অলৌকিক হৃদিবল
শোকে সুখে কি সন্তাপে অবিচ্ছিন্ন সহচরী
শান্তির ত্রিদিব ছায়া অঙ্কিত জীবনোপরি।
সে যে আঁধারের ফুল আঁধারে থাকিত ফুটি
আঁধারে ঝরিত তার শিশিরাক্ত আঁখি দু’টি;
শোকের বিরাম সে যে অশ্রুধারা তিতিক্ষার
শান্তি উপেক্ষার, পুলকের দ্যুলোক-বিহার।
কতদিন এ জীবনে উঠিয়াছে শশধর
বলিয়াছি “প্রণয়িনী” শুনিয়াছি “প্রাণেশ্বর”

ডুবিয়াছে সে শশাঙ্ক সুনীল গগনগায়
কে বলিতে পারে উঠিবেনা সে যে পুনরায়?
কিন্তু হায়! উন্মাদক “প্রণয়িনী, প্রাণেশ্বর”
হৃদয়ের বীণা-যন্ত্রে বাজিত যে মধুস্বর;
এখনো সে চির পরিচিত, বীণার ঝঙ্কার,
বাজিছে হৃদয়ে মম ক্ষীণ প্রতিধ্বনি তার
(নিরাশায় স্তব্ধ কর্ণ) শুনিতে কি পাব আর
এ জনমে কিম্বা মরণের যবনিকা পার?
যে মুহূর্ত্তে বিদ্যুদ্দাম স্নেহে ধরিলাম গলে
ছুটিল তড়িত-স্রোত হৃদয় আকাশ তলে,
সে মুহুর্ত্ত আহা! মানসের জনম নূতন,
বিষাদের বিসর্জ্জন, সৌভাগ্যের আবাহন
অশাস্তির উৎবন্ধন, প্রণয়ের প্রাণ-পণ
উৎস উৎসবের, কামনার ক্ষীরোদ মন্থন।
জীবনের অভাব অভাব যুগল মিলন
জগতের মোহ-মন্ত্র প্রণয়ের উচ্চারণ
জগতের প্রতি পরমাণু নূতনতা মাখা
প্রকৃতির পতাকায় যুগল চরিত্র আঁকা।
শান্তির ত্রিদিব মঞ্চে সৌভাগ্যের অভিনয়
অভিনেতা প্রেম, শ্রোতা তার ঐশ্বর্য্য প্রণয়,
ছলিছে বিজলী-হার বিজলী আলোক তার
ভবিষ্য-তিমির-গর্ভ উজলিছে বার বার,

অন্ধকার ভাগ করি ক্রমে ক্রমে অগ্রসরি
পথ দেখাইয়া চলে শৈশবের সহচরী,
যৌবনের প্রণয়িনী প্রণয়ের যজ্ঞস্থলে
গরল যাহাতে উঠে অমৃত যাহাতে ফলে।
আধেক জীবন কণ্টকিত সংকীর্ণ পন্থায়
পুষ্প সুরভিত পথে ভ্রমিয়াছি দু’জনায়;
পেয়েছি বিষমাঘাত কণ্টকের যাতনায়
চিহ্ণ যার রক্ত-বিন্দু সমস্ত জীবনে গায়
লভিয়াছি সুখ কুসুমের সুবাসে শোভায়
নন্দনের পারিজাত লুটায়ে গিয়েছে পায়
সুখের দ্বাদশ-বর্ষ হাত ধরাধরি করি
ভ্রমিয়াছি বনে বনে যাপিয়াছি বিভাবরী।
হেরিয়াছি উদয়াস্ত শশীর সাগর কূলে
নবীন রবির ছবি দেখেছি দিগন্তমূলে।
প্রকৃতির মাধুরীর নিমন্ত্রণ গান শুনি
ছিলাম দু’জনে আপনাতে পাশরি আপনি।
যেতাম যাদের কাছে ডাকিয়া আদর করে
দিত যা তাদের ছিল যতনে অঞ্চল ভরে।
কখনো সাগরে ভাসি তরঙ্গের ঘায় যায়
প্রেমের সুবর্ণ তরি দিগন্তের অন্তে যায়
উপহার দিত লহরীর কবরী ভূষণ—
জলধির রত্ন-রাশি মানবের আকিঞ্চন।

অযাচিত পেতো দান আকাঙ্ক্ষা—রহিত প্রাণ
কেন বা তাদের পানে চাবে লোভে দু’নয়ান।
কে জানিত এসংসারে ক্ষুদ্র এই প্রাণাধারে
কত সুখ কত দুঃখ কত কি থাকিতে পারে?
নিরানন্দ স্রোত—হরষের উৎসব সঙ্গীত
আশার ছলনা মায়া ভ্রম সংজ্ঞা বিজড়িত,
সদসৎ মিলন বিচ্ছেদ প্রেম অপ্রণয়
হাসি কান্না শোক শাস্তি পাপ পবিত্রতাময়
নিরাশ লাঞ্ছনা—কল্পনার আশ্বাস বচন
নিদাঘের তাপ, শীত, বসন্তের সমীরণ
শরতের চাঁদ, মেঘমুক্ত অরুণ কিরণ
শোভে যুগপৎ এজীবনে জনম মরণ।
যাহার কিরণে দীপ্ত অমাবস্যা অন্ধকার
যার সমাগমে কারাগার পুলক আগার
দিবস যামিনী সম নক্ষত্র-খচিত হয়
শারদ শশাঙ্ক উঠে মৃদু সন্ধ্যানিল বয়;
হেমন্তে বসন্ত আসে অমায় চন্দ্রমা হাসে
প্রফুল্লিত হৃদাকাশে ফুল্ল শতদল ভাসে।
যার হাসি মুখে প্রফুল্লিত বিষণ্ণ সংসার
যার অশ্রুজলে মসি সিক্ত জীবন আঁধার।
 যার সহবাসে নরক যে স্বরগ আমার
মরুভূমি কুঞ্জবন—নিগড় কুমুম হার

যাতনা বিশ্রাম—বিষাদও যে সুখের আধার
প্রলয় প্লাবনে সে যে সুখ শৈলেন্দ্র-বিহার।
যাহার অভাবে জীবনের পূর্ণিমা নিশায়
চিরাবৃত সুখ বিষাদের তামসী ছায়ায়।
নীরব কবিতা ভাষা সঙ্গীত সমাধিগত
হৃদয় উদ্যমশূন্য যৌবন আঁধার মত।
হতাশ প্রণয়ে আক্ষেপের সম্পূর্ণ বিকাশ
ঔদাসীন্য সর্ব্বকার্য্যে নিয়ন্তায় অবিশ্বাস।
সেই বুকভরা ধন কুসুমের কণ্ঠহার
ত্রয়োদশ বর্ষে একদিন শেষ বরিষার
শিখর বিহার হতে নীচে নামিবার কালে
স্খলিত চরণে, বিজড়িত কণ্টকের জালে
প্রেমময় দাম, ভরে দেহ পড়িল ভূতলে
পালটিতে আঁখি কণ্ঠহার ছিঁড়িল সবলে!
শরীর চেতনা হারা ছিল ‘অবনীতে’ মিশে
সঞ্জীবনী মালা গেছে জীবন বাঁচিবে কিসে?
শৈশবে বাঁধিল যারে অঞ্চলের গ্রন্থি দিয়া
যৌবনে তাদেরে নিয়ে হিয়াতে বাঁধিল হিয়া।
সেই সহচরী প্রণয়ের গ্রন্থিচ্ছেদ করি।
বিজনে বিহরে অজ্ঞাত পদবী অনুসরি।
সে অবধি এজগতে ভ্রমি আমি আত্মহারা
যেন সৌর জগতের কেন্দ্রভ্রষ্ট গ্রহ তারা।

লক্ষ্যহীন, সত্যে মিথ্যা, নূতনে পুরান জ্ঞান
অসামর্থ্য স্মৃতি ভুলে যায় হৃদয়ের গান;
পর্ব্বতে বুদ্বুদ ভাসে অনল সাগর গায়
উচ্ছৃঙ্খলে অনিয়মে জীবন বহিয়া যায়।
না ফুটিতে ফুল শোভা সুবাস ঝরিয়া যায়
না উঠিতে মিশে শশী নীল গগনের গায়।
না হইতে শতাব্দীর চতুর্থাংশ সমাপন
জীবনের মহাব্রত সৌভাগ্যের উদ্যাপন।
বহুক্ষণ পরে চেতনার বিষম যাতনা
পশিল হৃদয়ে, বিষাদের পুরিল বাসনা।
বিষাদের হাত ধরে উঠিলাম ধীরে ধীরে
মেলিলাম আঁখি, চারি দিক্‌ আচ্ছন্ন তিমিরে।
মধ্যাহ্নে রজনী হেরি আশঙ্কা হইল প্রাণে
কে যেন কোথায় থেকে বলে দিল কাণে কাণে
সেই কুসুমের হার বিজলী আলোকাধার
নাহি গলে তোর কিসে তোর ঘুচিবে আঁধার
বিজলিরে যথা অকুসরে অশনি নিপাত
দিবা রজনীরে; অনিচ্ছায়, তেমতি এহাত
কণ্ঠ পরশিল, নাহি সেথা সে অমূল্য-হার
দরিদ্রের কহিনুর জীবনের অহঙ্কার,
শেষ বরিষায়, মনে হলো শিখর বিহার
স্খলিত চরণে, বিখণ্ডিত গ্রন্থি মালিকার

কন্টকের জালে, জীবনের অতট পতন
চেতনা রহিত, বিষাদের মন্ত্র সঞ্জীবন।
কে জানিত আগে ফুলদল কঠিন এমন
কর্কশ তেমন, তুষারের সন্তাপ যেমন।
ঘুচিয়াছে কণ্ঠহার, ঘুচে নাই সব তার
এখনো এখনো কণ্ঠে ক্ষত দাগ চক্রাকার;
প্রত্যেক পরশে ক্ষত দ্বিগুণিত যাতনায়
বিষম বেদনা জ্বালা আর নাহি সহা যায়।
সান্ত্বনা মলয়ানিলে কিম্বা স্নিগ্ধ বিলেপনে
শতগুণ উঠে জ্বলি অনিবার্য্য হুতাশনে।
ছিঁড়িয়াছে কন্ঠহার নাহি কি গলায় হার?
আছে হার সন্তাপিত বিষাদের অশ্রুভার।
না বহে মলয় বায়ু যেমন বহিত আগে
নিরাশ হৃদয়ে আর কিছু নাহি ভালো লাগে।
হেমন্তের শিশিরাক্ত বসন্তের ফুলভার
রমনী অধর নেত্রে নাহি মধুরতা আর
মেঘেতে বিজলী হাসি শারদ পূর্ণিমা আলো
কালের শাসনে আজ সেও ত না লাগে ভালো।
এ জীবন সাহারায় মৃত্যু সুশীতল জল
নিরাশ্রয় উপায়হীনের শরণ সম্বল
মরণ জাহ্নবী জলে যাতনার মুক্তিস্নান
মরণের কোলে জুড়ায় এ তাপদগ্ধ প্রাণ।

কে জানে মানব কেন মরণেরে নাহি চায়?
ম’লে শোক ঘুচে নিরাশার আগুন নিবায়।
এ জনমে দেখা যার পাবো কি না পাবো আর
মরণের অন্তরালে পেতে পারি দেখা তার।
চারি চক্ষে সেই দিন না যদি হইত দেখা
তা’হলে কাটিত সুখে সারাটি জীবন-একা।