সচিত্র রেল অবতার/মূর্খস্য লাঠ্যৌষধি

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

মূর্খস্য লাঠ্যৌষধি।

 হর্ষনাথবাবু—বড়সাহেবের বড়বাবু ছিলেন। তার চাল্ চলন সব সাহেবী কায়দার। হর্ষনাথবাবু আপিসে থাকিলে, চুণোপুঁটি কেরাণীর দল সব চুপ চাপ, কাহারও ট্যাঁ ফোঁ করিবার ক্ষমতা হইত না। বিনাহুকুমে আফিসের ভিতর যায় কার সাধ্য? তা, কি সাহেব—কি বাঙ্গালী! হর্ষনাথবাবু বড়সাহেবের ডানহাত—বাঁহাত—কাজেই তাঁহাকে ভয় করে, এমন লোক নাই বলিলেই চলে।

 খুব বেশী জরুরী চিঠি ছাড়া, আর সব চিঠিপত্র হর্ষনাথ বাবু সহি করিয়া থাকেন। অবশ্য বড়সাহেবের প্রতিনিধি স্বরূপ সহি করবার ক্ষমতা তাঁহাকে দেওয়া হইয়াছে।

 একদিন বড়সাহেব লাইনে বাহির হইয়া গিয়াছেন। বড়বাবু চিঠিপত্র সহি করিতেছেন, এমন সময় একজন কেরাণীবাবু আসিয়া বলিলেন “দেখুন, এ চিঠিখানা ডাকে পাঠিয়ে দিতে সাহেবের ভুল হয়ে গেছে; আপনি এটা সহি করে দিতে পারেন না?”

 বড়বাবু চিঠিখানা পড়িয়া দেখিলেন— সাহেবের হুকুম মত একজন ফিরিঙ্গী গার্ডকে ৫৲ পাঁচ টাকা জরিমানা করা হইয়াছে— ছুটী, জরিমানা, বদলি ও নিয়োগের চিঠি, বড়সাহেবই সহি করিয়া থাকেন; বড়বাবু এ পর্যন্ত এরূপ চিঠি কখনও সহি করেন নাই—তাই কেরাণী বাবু জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন।

 বড়বাবু কিছুক্ষণ ভাবিয়া গম্ভীর ভাবে বলিলেন “এ আর তেমন কি চিঠি যে আমি সহি করতে পারব না।” এই বলিয়া সে চিঠি খানা সই করিয়া দিলেন। ভূল হওয়ার জন্য কেরাণীবাবুকে একটু তিরস্কার করিতেও ছাড়িলেন না।

 * * * 

 তার পরদিন সকালে চিঠি খানা পাইয়া গার্ড সাহেব ত একেবারে খাপ্পা। একে জরিমানার চিঠি, তা’তে কালা-বাঙ্গালীর সই। গার্ড সাহেবের রংটা খুব ফেঁকাসে না হইলেও, একটু সাদা ছিল; কাজেই তিনি কালা আদমী একবারেই দেখিতে পারিতেন না। জরিমানা হওয়ায় গার্ড সাহেব রাগে অন্ধকার দেখিতেছিলেন—তা’তে বড় সাহেবের সহি না দেখিয়া, মনে ভাবিলেন, জরিমানাটা বড় বাবুরই কাজ; বড় সাহেবকে না জানাইয়া চুপে চুপে করা হইয়াছে। এই কালা বাঙ্গালীটা, ভারী তুখড়,—ভারী পাজী।

 চিঠি খানা লইয়া গার্ড সাহেব ষ্টেশন-মাষ্টারের কাছে গেলেন। ষ্টেশন-মাষ্টার ইংরাজ, বহুদিন ধরিয়া রেলে কাজ করিতেছেন।

 গার্ডসাহেব বলিলেন—“দেখুন দেখি মশায়, একটা কালা বাঙ্গালীর আস্পর্দ্ধা! বড় সাহেবকে না জানিয়ে, আমাকে পাঁচ টাকা জরিমানা করা হয়েছে! এ রকম চিঠি সই করবার, সে বেটা কে? এর একটা হেস্তনেস্ত না করে, আমি কিছুতেই ছাড়্‌ছি না!”

 আরও দুই চারি জন গার্ডসাহেব সেই ষ্টেশন-মাষ্টারের আফিসে ছিলেন। তাঁরা বলিলেন—“বড় বাবু হলে কি হয়?—আমাদের নামের একটা সামান্য চিঠিও সে সই করে কিসে? আমরা য়ুরোপীয়ান্‌—আমাদের চিঠি নেটিভে সই কর্ব্বে? এর একটা প্রতীকার আমাদের শীঘ্রই কর্‌তে হচ্ছে—না হলে মান ইজ্জত কিছুই থাকে না।”

 তারপর যুক্তি পরামর্শ করিয়া, কালা বাঙ্গালীর দর্প চূর্ণ করিবার জন্য একটা লম্বা দরখাস্ত লেখা হইল। ষ্টেশনের যত ফিরিঙ্গীর দল সবাই সহি করিলেন।

 স্টেশন-মাষ্টারের পরামর্শ মত একখানা আলাদা দরখাস্তে, গার্ডসাহেব জরিমানার বিষয়ে পুনর্ব্বিচার প্রার্থনা করিলেন; আর তিনি য়ুরোপীয়ান বলিয়া, চিঠিতে বাঙ্গালীর সহি থাকায়, অপমানিত বোধ করিয়াছেন, একথাও বিশেষ করিয়া জানাইলেন।

 দুইখানি দরখাস্ত একদিনেই বড় সাহেবকে পাঠান হইল।

  *  *  *

 দুই তিন দিন পরে বড় সাহেব আফিসে ফিরিয়া আসিলেন। দরখাস্ত দুই খানা দেখিয়া ব্যাপার কিছু বুঝ্‌তে পারিলেন না। বড় বাবুকে ডাকিয়া পাঠাইলেন।

 বড় বাবু আসিলে বলিলেন “ব্যাপার কি, গাঙ্গুলী?”

 হর্ষনাথ বাবু বলিলেন “ব্যাপার আর কিছু নয়। এ চিঠিখানা আপনার ডাকে পাঠাতে ভুল হ’য়ে গেছল। চিঠিখানা তেমন কিছু জরুরী না দেখে, আমিই সই করে পাঠিয়ে দিয়েছিলুম। আপনি তাকে জরিমানা করেছেন, আমি আপনার বকলম (for) দিয়ে সহি করেছি মাত্র। এই আমার অপরাধ!”

 সাহেব ব্যাপার বুঝিয়া হাসিয়া বলিলেন—“আচ্ছা, আপনি এখন যান্। পরে আমি হুকুম দেব।”

 * * *

 পরদিন সকালে সেই গার্ডসাহেবের নামে চিঠি আসিল। চিঠিখানা—আগেকার চিঠিখানার হুবহু নকল। প্রভেদের মধ্যে এই যে—চিঠিখানা গোটা গোটা অক্ষরে বড় সাহেবের হাতে লেখা, কিন্তু সহিটা সেই বড়বাবুর-ই! কেরাণীবাবুদের মত সহিটার নীচে, বড়সাহেব তাঁর নামের অক্ষর গুলি (Initial) লিখিয়া দিয়াছেন মাত্র।

 গার্ডসাহেবের ত চক্ষু স্থির! অন্যান্য সাহেবেরাও মুখ ব্যাদান করিলেন।

 ষ্টেশন-মাষ্টার বলিলেন “কাল সন্ধ্যার পর, বড়সাহেবের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। কথাপ্রসঙ্গে তিনি বল্লেন “তুমি দরখাস্তকারী মূর্খ গার্ডগুলোকে বলো যে, চিঠিগুলো আমার কাছ থেকেই আসে। হেডক্লার্ক বাবু কিছু হুকুম জারি করেন না! বাঙ্গালী দি’কেই নিয়ে আমার অফিস চল্‌ছে, কাজেই তা’ দিকে আমি ছাড়তে পারি না। যদি কাল-আদমির ওপর এত ঘৃণা থাকে, তা’হলে তা’দিকে বলো—ইচ্ছে হ’লে তারা চলে যেতে পারে, তা’তে রেলের কিছু ক্ষতি হবে না।” এখন তোমরা যাহা ইচ্ছা তাহা করতে পারো। কিন্তু আমার মতে, বড় সাহেব ঠিক কথাই বলেছেন, একথা নিয়ে আর আন্দোলন করা উচিত নয়।”

 ফিরিঙ্গী গার্ডসাহেবেরা চেঁচামেচি করিয়া বলিলেন—“ও বড় সাহেব কখনও আমাদের মত খাসবিলাতী নয়। ও বেটা স্বজাতিদ্রোহী, তা না হলে বাঙ্গালীর এত খোসামুদে হয়? নিজে চিঠিখানা লিখে—বাঙ্গালীর দস্তখত করিয়ে, আমাদিগকে বেশী অপমান করবার জন্য পাঠিয়ে দেয়? আমরা এ কথাটা উপরে জানাব, দেখি এর প্রতীকার হয় কি না?”

 এরপর সাহেবের দল কি করিয়াছিলেন, বলিতে পারি না; তবে হর্ষনাথ বাবু, এখন হইতে সব চিঠিই সহি করিতেন এ কথা আমরা নিঃসন্দেহে বলিতে পারি।