সমাজ/সমুদ্রযাত্রা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


বাংলাদেশে সমুদ্রযাত্রার আন্দোলন প্রায় সমুদ্র-আন্দোলনের তুল্য হইয়া দাঁড়াইয়াছে । সংবাদপত্র এবং চটি পুঁথি বাক্যোচ্ছ্বাসে ফেনিল ও স্ফীত হইয়া উঠিয়াছে , পরস্পর আঘাত প্রতিঘাতেরও শেষ নাই ।

তর্কটা এই লইয়া যে , সমুদ্রযাত্রা শাস্ত্রসিদ্ধ না শাস্ত্রবিরুদ্ধ । সমুদ্রযাত্রা ভালো কি মন্দ তাহা লইয়া কোনো

কথা নহে । কারণ , যাহা অন্য হিসাবে ভালো অথবা যাহাতে কোনো মন্দর সংস্রব দেখা যায় না , তাহা যে

শাস্ত্রমতে ভালো না হইতে পারে , এ কথা স্বীকার করিতে আমাদের কোনো লজ্জা নাই ।

যাহাতে আমাদের মঙ্গল , আমাদের শাস্ত্রের বিধানও তাহাই , এ কথা আমরা জোর করিয়া বলিতে পারি না । তাহা যদি পারিতাম , তবে সেই মঙ্গলের দিক হইতে যুক্তি আকর্ষণ করিয়া শাস্ত্রের সহিত মিলাইয়া দিতাম । আগে দেখাইতাম , অমুক কার্য আমাদের পক্ষে ভালো এবং অবশেষে দেখাইতাম তাহাতে আমাদের শাস্ত্রের সম্মতি আছে ।

সমুদ্রযাত্রার উপকারিতার পক্ষে ভুরি ভুরি প্রমাণ থাক্‌ - না কেন , যদি শাস্ত্রে তাহার বিরুদ্ধে একটিমাত্র বচন থাকে , তবে সমস্ত প্রমাণ ব্যর্থ হইবে । তাহার অর্থ এই , আমাদের কাছে সত্যের অপেক্ষা বচন বড়ো , মানবের শাস্ত্রে নিকট জগদীশ্বরের শাস্ত্র ব্যর্থ ।

শাস্ত্রই যে সকল সময়ে বলবান তাহাও নহে । অনেকে বলেন বটে , ঋষিদের এমন অমানুষিক বুদ্ধি ছিল যে , তাঁহারা যে - সকল বিধান দিয়াছেন , সমস্ত প্রমাণ তুচ্ছ করিয়া আমরা অন্ধবিশ্বাসের সহিত নির্ভয়ে তাহা পালন করিয়া যাইতে পারি । কিন্তু সমাজে অনেক সময়েই শাস্ত্রবিধি ও ঋষিবাক্য তাঁহারা লঙ্ঘন করেন এবং লোকাচার ও দেশাচারের দোহাই দিয়া থাকেন ।

তাহাতে এই প্রমাণ হয় যে শাস্ত্রবিধি ও ঋষিবাক্য অভ্রান্ত নহে । যদি অভ্রান্ত হইত , তবে লোকাচার তাহার কোনোরূপ অন্যথা করিলে লোকাচারকে দোষী করা উচিত হইত । কিন্তু দেশাচার ও লোকাচারের প্রতি যদি শাস্ত্রবিধি সংশোধনের ভার দেওয়া যায় , তবে শাস্ত্রের অমোঘতা আর থাকে না ; তবে স্পষ্ট মানিতে হয় , শাস্ত্রশাসন সকল কালে সকল স্থানে খাটে না ।

তাহা যদি না খাটিল , তবে আমাদের কর্তব্যের নিয়ামক কে । শুভবুদ্ধিও নহে , শাস্ত্রবাক্যও নহে । লোকাচার । কিন্তু লোকাচারকে কে পথ দেখাইবে । লোকাচার যে অভ্রান্ত নহে , ইতিহাসে তাহার শতসহস্র প্রমাণ আছে । লোকাচার যদি অভ্রান্ত হইত , তবে পৃথিবীতে এত বিপ্লব ঘটিত না , এত সংস্কারকের অভ্যুদয় হইত না ।

বিশেষত যে - লোকসমাজের মধ্যে জীবনপ্রবাহ নাই , সেখানকার জড় লোকাচার আপনাকে আপনি সংশোধন করিতে পারে না । স্রোতের জল অবিশ্রান্ত গতিবেগে নিজের দূষিত অংশ ক্রমাগত পরিহার করিতে থাকে । কিন্তু বদ্ধ জলে দোষ প্রবেশ করিলে তাহা সংশোধিত হইতে পারে না , উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতে থাকে ।

আমাদের সমাজ বদ্ধ সমাজ । একে তো আভ্যন্তরিক সহস্র আইনে বদ্ধ , তাহার পরে আবার ইংরেজদের আইনেও বাহির হইতে আষ্টেপৃষ্টে বন্ধন পড়িয়া গেছে । সমাজসংশোধনে স্বদেশীয় রাজার স্বাভাবিক অধিকার ছিল এবং পূর্বকালে তাঁহারা সে - কাজ করিতেন । কিন্তু অনধিকারী ইংরেজ আমাদের সমাজকে যে - অবস্থায় হাতে পাইয়াছে , ঠিক সেই অবস্থায় দৃঢ়ভাবে বাঁধিয়া রাখিয়াছে । সে নিজেও কোনো নূতন নিয়ম প্রচলিত করিতে সাহস করে না , বাহির হইতেও কোনো নূতন নিয়মকে প্রবেশ করিতে দেয় না । কোন্‌টা বৈধ কোন্‌টা অবৈধ তাহা সে অন্ধভাবে নির্দিষ্ট করিয়া দিয়াছে । এখন সমাজের কোনো সচেতন স্বাভাবিক শক্তি সহজে কোনোরূপ পরিবর্তন সাধন করিতে পারে না ।

এমন বাঁধা - সমাজের মধ্যে যদি লোকাচার মানিতে হয় , তবে একটা মৃত দেবতার পূজা করিতে হয় । সে কেবল একটা নিশ্চল নিশ্চেষ্ট জড় কঙ্কাল । সে চিন্তা করে না , অনুভব করে না , সময়ের পরিবর্তন উপলব্ধি করিতে পারে না । তাহার দক্ষিণে বামে নড়িবার শক্তি নাই । সমস্ত হতভাগ্য জাতি , তাহার সমস্ত ভক্ত উপাসক , যদি তাহার সম্মুখে পড়িয়া পলে পলে আপনার মরণব্রত উদ্‌যাপন করে , তথাপি সে কল্যাণপথে তিলার্ধমাত্র অঙ্গুলিনির্দেশ করিতে পারে না ।

যাঁহারা শাস্ত্র হইতে বিধি সংগ্রহ করিয়া লোকাচারকে আঘাত করিতে চেষ্টা করেন , তাঁহারা কী করেন । তাঁহারা মৃতকে মারিতে চাহেন । যাহার বেদনাবোধ নাই তাহার প্রতি অস্ত্র প্রয়োগ করেন , যে অন্ধ তাহার নিকট দীপশিখা আনয়ন করেন । অস্ত্র প্রতিহত হয় , দীপশিখা বৃথা আলোকদান করে ।

তাঁহাদের আর - একটা কথা জানা উচিত । শাস্ত্রও এক সময়ের লোকাচার । তাঁহারা অন্য সময়ের লোকাচারকে স্বপক্ষভুক্ত করিয়া বর্তমানকালের লোকাচারকে আক্রমণ করিতে চাহেন । তাঁহারা বলিতে চাহেন , বহুপ্রাচীনকালে সমুদ্রযাত্রার কোনো বাধা ছিল না । বর্তমান লোকাচার বলে , তখন ছিল না এখন আছে ; ইহার কোনো উত্তর নাই ।

এ যেন এক শত্রুকে তাড়াইবার উদ্দেশ্যে আর - এক শত্রুকে ডাকা । মোগলের হাত হইতে রক্ষা পাইবার জন্য পাঠানের হাতে আত্মসমর্পণ করা । যাহার নিজের কিছুমাত্র শক্তি আছে , সে এমন বিপদের খেলা খেলিতে চাহে না ।

আমাদের কি নিজের কোনো শক্তি নাই । আমাদের সমাজে যদি কোনো দোষের সঞ্চার হয় , যদি তাহার কোনো ব্যবস্থা আমাদের সমস্ত জাতির উন্নতিপথের ব্যাঘাতস্বরূপ আপন পাষাণমস্তক উত্তোলন করিয়া থাকে , তবে তাহা দূর করিতে গেলে কি আমাদিগকে খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে , বহু প্রাচীনকালে তাহার কোনো নিষেধবিধি ছিল কি না । যদি দৈবাৎ পাওয়া গেল , তবে দিনকতক পণ্ডিতে পণ্ডিতে শাস্ত্রে শাস্ত্রে দেশব্যাপী একটা লাঠালাঠি পড়িয়া গেল ; আর যদি দৈবাৎ অনুস্বারবিসর্গবিশিষ্ট একটা বচনার্ধ না পাওয়া গেল , তবে আমরা কি এমনি নিরুপায় যে , সমাজের সমস্ত অসম্পূর্ণতা সমস্ত দোষ শিরোধার্য করিয়া বহন করিব , এমন - কি তাহাকে পবিত্র বলিয়া পূজা করিব । দোষও কি প্রাচীন হইলে পূজ্য হয় ।

আমরা কি নিজের কর্তব্যবুদ্ধির বলে মাথা তুলিয়া বলিতে পারি না—পূর্বে কী ছিল এবং এখন কী আছে তাহা জানিতে চাহি না , সমাজের যাহা দোষ তাহা দূর করিব , যাহা মঙ্গল তাহা আবাহন করিয়া আনিব । আমাদের শুভাশুভ জ্ঞানকে হস্তপদ ছেদন করিয়া পঙ্গু করিয়া রাখিয়া দিব , আর একটা গুরুতর আবশ্যক পড়িলে , দেশের একটা মহৎ অনিষ্ট একটা বৃদ্ধ অকল্যাণ দূর করিতে হইলে , সমস্ত পুরাণসংহিতা আগমনিগম হইতে বচনখণ্ড খুঁজিয়া খুঁজিয়া উদ্‌ভ্রান্ত হইতে হইবে—সমাজের হিতাহিত লইয়া বয়স্ক লোকের মধ্যে এরূপ বাল্যখেলা আর কোনো দেশে প্রচলিত আছে কি ।

আমাদের ধর্মবুদ্ধিকে সিংহাসনচ্যুত করিয়া যে - লোকাচারকে তাহার স্থলে অভিষিক্ত করিয়াছি , সে আবার এমনি মূঢ় অন্ধ যে , সে নিজের নিয়মেরও সংগতি রক্ষা করিতে জানে না । কত হিন্দু যবনের জাহাজে চড়িয়া উড়িষ্যা মাদ্রাজ সিংহল ভ্রমণ করিয়া আসিতেছে , তাহাদের জাতি লইয়া কোনো কথা উঠিতেছে না , এ দিকে সমুদ্রযাত্রা বিধিসংগত নহে বলিয়া লোকসমাজ চীৎকার করিয়া মরিতেছে । দেশে শত শত লোক অখাদ্য ও যবনান্ন খাইয়া মানুষ হইয়া উঠিল , প্রকাশ্যে যবনের প্রস্তুত মদ্য পান করিতেছে , কেহ সে দিকে একবার তাকায়ও না , কিন্তু বিলাতে গিয়া পাছে অনাচার ঘটে এজন্য বড়ো শঙ্কিত । কিন্তু যুক্তি নিষ্ফল । যাহার চক্ষু আছে তাহার নিকট এ - সকল কথা চোখে আঙুল দিয়া দেখাইবারও আবশ্যক ছিল না । কিন্তু লোকাচার নামক প্রকাণ্ড জড়পুত্তলিকার মস্তকের অভ্যন্তরে তো মস্তিষ্ক নাই , সে একটা নিশ্চল পাষাণমাত্র । কাককে ভয় দেখাইবার নিমিত্ত গৃহস্থ হাঁড়ি চিত্রিত করিয়া শস্যক্ষেত্রে খাড়া করিয়া রাখে , লোকাচার সেইরূপ চিত্রিত বিভীষিকা । যে তাহার জড়ত্ব জানে সে তাহাকে ঘৃণা করে , যে তাহাকে ভয় করে তাহার কর্তব্যবুদ্ধি লোপ পায় ।

আজকাল অনেক পুস্তক ও পত্রে আমাদের বর্তমান লোকাচারের অসংগতিদোষ দেখানো হয় । বলা হয় , এক দিকে আমরা বাধ্য হইয়া অথবা অন্ধ হইয়া কত অনাচার করি , অন্য দিকে সামান্য আচার বিচার লইয়া কত কড়াক্কড় । কিন্তু হাসি পায় যখন ভাবিয়া দেখি , কাহাকে সে - কথাগুলো বলা হইতেছে । শিশুরা পুত্তলিকার সঙ্গেও এমনি করিয়া কথা কয় । কে বলে লোকাচার যুক্তি অথবা শাস্ত্র মানিয়া চলে । সে নিজেও এমন মহা অপরাধ স্বীকার করে না । তবে তাহাকে যুক্তির কথা কেন বলি ।

সমাজের মধ্যে যে - কোনো পরিবর্তন ঘটিয়াছে , তাহা বিনা যুক্তিতেই সাধিত হইয়াছে । গুরুগোবিন্দ , চৈতন্য যখন এই জাতিনিগড়বদ্ধ দেশে জাতিভেদ কথঞ্চিৎ শিথিল করেন , তখন তাহা যুক্তিবলে করেন নাই , চরিত্রবলে করিয়াছিলেন ।

আমাদের যদি এরূপ মত হয় যে , সমুদ্রযাত্রায় উপকার আছে ; মনুর যে - নিষেধ বিনা কারণে ভারতবর্ষীয়দিগকে চিরকালের জন্য কেবল পৃথিবীর একাংশেই বদ্ধ করিয়া রাখিতে চাহে , সেই কারাদণ্ডবিধান নিতান্ত অন্যায় ও অনিষ্টজনক , দেশে - বিদেশে গিয়া জ্ঞান - অর্জন ও উন্নতিসাধন হইতে কোনো প্রাচীন বিধি আমাদিগকে বঞ্চিত করিতে পারে না ; যিনি আমাদিগকে এই সমুদ্রবেষ্টিত পৃথিবীতে প্রেরণ করিয়াছেন , তিনি আমাদিগকে সমস্ত পৃথিবী ভ্রমণের অধিকার দিয়াছেন—তবে আমরা আর কিছু শুনিতে চাহি না—তবে কোনো শ্লোকখণ্ড আমাদিগকে ভয় দেখাইতে , কোনো লোকাচার আমাদিগকে নিষেধ করিতে পারে না ।

বাঁধও ভাঙিয়াছে । কেহ শাস্ত্র ও লোকাচারের মুখ চাহিয়া বসিয়া নাই । বঙ্গগৃহ হইতে সন্তানগণ দলে দলে সমুদ্রপার হইতেছে , এবং ক্ষীণবল সমাজ তাহার কোনো প্রতিবিধান করিতে পারিতেছে না । সমাজের প্রধান বল নীতিবল যখন চলিয়া গিয়াছে , তখন তাহাকে বেশিদিন কেহ ভয় করিবে না । যে - সমাজ মিথ্যাকে কপটতাকে মার্জনা করে , অর্ধগুপ্ত অনাচারের প্রতি জানিয়া - শুনিয়া চক্ষু নিমীলন করে , যাহার নিয়মের মধ্যে কোনো নৈতিক কারণ কোনো যৌক্তিক সংগতি নাই , সে যে নিতান্ত দুর্বল । সমাজের সমস্ত বিশ্বাস যদি দৃঢ় হইত , যদি সেই অখণ্ড বিশ্বাস অনুসারে সে নিজের সমস্ত ক্রিয়াকলাপ নিয়মিত করিত , তবে তাহাকে লঙ্ঘন করা বড়ো দুরূহ হইত ।

যাঁহারা শুভবুদ্ধির প্রতি নির্ভর না করিয়া শাস্ত্রের দোহাই দিয়া সমুদ্রযাত্রা করিতে চান , তাঁহারা দুর্বল । কারণ , তাঁহাদের পক্ষে কোনো যুক্তি নাই ; সমাজ শাস্ত্রমতে চলে না ।

দ্বিতীয় কথা এই , লোকাচার যে সমুদ্রযাত্রা নিষেধ করে তাহার একটা অর্থ আছে । হিন্দুসমাজের অনেকগুলি নিয়ম পরস্পর দৃঢ়সম্বন্ধ । একটা ভাঙিতে গেলে আর - একটা ভাঙিয়া পড়ে । রীতিমত স্ত্রীশিক্ষা প্রচলিত করিতে গেলে বাল্যবিবাহ তুলিয়া দিতে হয় । বাল্যবিবাহ গেলে ক্রমশই স্বাধীনবিবাহ আসিয়া পড়ে । স্বাধীনবিবাহ প্রচলিত করিতে গেলে সমাজের বিস্তর রূপান্তর অবশ্যম্ভাবী হইয়া পড়ে এবং জাতিভেদের মূল ক্রমে জীর্ণ হইয়া আসে । কিন্তু তাই বলিয়া এখন স্ত্রীশিক্ষা কে বন্ধ করিতে পারে ।

সমুদ্র পার হইয়া বিদেশযাত্রাও আমাদের বর্তমান সমাজ রক্ষার পক্ষে সম্পূর্ণ অনুকূল নহে । আমাদের সমাজে কোনো অবসর নাই । আমরা নিশ্চেষ্ট নিশ্চল অন্ধভাবে সমাজের অন্ধকূপে এক অবস্থায় পড়িয়া থাকিব , লোকাচারের এই বিধান । মৃত্যুর ন্যায় শান্ত অবস্থা আর নাই , সেই অগাধ শান্তি লাভ করিবার জন্য যতদূর সম্ভব আমাদের জীবনীশক্তি লোপ করা হইয়াছে । একটি সমগ্র বৃহৎ জাতিকে সম্পূর্ণ নিশ্চেষ্ট ও নির্জীব করিয়া ফেলিতে অল্প আয়োজন করিতে হয় নাই । কারণ মনুষ্যত্বের অভ্যন্তরে একটি অমর জীবনের বীজ নিহিত আছে যে , সে যদি কোনো ছিদ্র দিয়া একটুখানি স্বাধীন সূর্যালোক ও বৃষ্টিধারা প্রাপ্ত হয় , অমনি অঙ্কুরিত পল্লবিত বিকশিত হইয়া উঠিতে চেষ্টা করে । সেই ভয়ে আমাদের হিন্দুসমাজ কোথাও কোনো ছিদ্র রাখিতে চাহে না । আমাদের জীবন্ত মনুষ্যত্বের উপরে নিয়মের পর নিয়ম পাষাণ ইষ্টকের ন্যায় স্তরে স্তরে গাঁথিয়া তুলিয়া একটি দেশব্যাপী অপূর্ব প্রকাণ্ড কারাপুরী নির্মাণ করা হইয়াছে । যেখানেই কালক্রমে একটি ইষ্টক খসিয়া পড়িতেছে , একটি ছিদ্র আবিষ্কৃত হইতেছে , সেইখানেই পুনর্বার নূতন মৃত্তিকালেপ ও নূতন ইষ্টকপাত করিতে হইতেছে । আমাদের সমাজ জীবন্ত নহে , তাহার হ্রাসবৃদ্ধি পরিবর্তন নাই , তাহা সুসম্বন্ধ , পরিপাটি প্রকাণ্ড জড় অট্টালিকা । তাহার প্রত্যেক কক্ষ পরিমিত , তাহার প্রত্যেক ইষ্টক যথাস্থানে বিন্যস্ত ।

স্বাধীনতাই এ সমাজের সর্বপ্রধান শত্রু । যে রৌদ্র বৃষ্টি বায়ুতে জীবিত পদার্থের জীবনধারণ হয় , সেই রৌদ্র বৃষ্টি বায়ুতেই ইহার ইষ্টক জীর্ণ করে , এইজন্য সমাজশিল্পী অদ্ভুত নৈপুণ্যসহকারে এই কারাগারের মধ্যে সমস্ত স্বাধীন স্বাভাবিক শক্তির প্রবেশ প্রতিরোধ করিয়াছে ।

যে যেখানে আছে , সে ঠিক সেইখানেই থাকিলে তবে এই জড়সমাজ রক্ষিত হয় । তিলমাত্র নড়িলে - চড়িলে সমস্তটাই সশব্দে পড়িয়া যাইবার সম্ভাবনা , এইজন্য যেখানেই জীবনচাঞ্চল্য লক্ষিত হয় , সেখানেই তৎক্ষণাৎ চাপ দিতে হয় ।

সমুদ্র পার হইয়া নূতন দেশে নূতন সভ্যতার নূতন নূতন আদর্শ লাভ করিয়া আমাদের মনের মধ্যে চিন্তার বন্ধনমুক্তি হইবে , তাহার সন্দেহ নাই । যে - সমস্ত নিয়ম আমরা বিনা সংশয়ে আজন্মকাল পালন করিয়া আসিয়াছি , কখনো কারণ জিজ্ঞাসাও মনে উদয় হয় নাই , সে - সম্বন্ধে নানা যুক্তি তর্ক ও সন্দেহের উদ্ভব হইবে । সেই মানসিক আন্দোলনই হিন্দুসমাজের পক্ষে সর্বাপেক্ষা আশঙ্কার কারণ । বাহ্যত ম্লেচ্ছা সংসর্গ ও সমুদ্র পার হওয়া কিছুই নহে , কিন্তু সেই অন্তরের মধ্যে স্বাধীন মনুষ্যত্বের সঞ্চার হওয়া যথার্থ লোকাচারবিরুদ্ধ ।

কিন্তু হায় , আমরা সমুদ্র পার না হইলেও মনুর সংহিতা অন্য জাতিকে সমুদ্র পার হইতে নিষেধ করিতে পারেন নাই । নূতন জ্ঞান , নূতন আদর্শ , নূতন সন্দেহ , নূতন বিশ্বাস জাহাজ - বোঝাই হইয়া এ দেশে আসিয়া পৌঁছিতেছে । আমাদের যে গোড়াতেই ভ্রম । সমাজরক্ষার জন্য যদি আমাদের এত ভয় , এত ভাবনা , তবে গোড়ায় ইংরেজি - শিক্ষা হইতে আপনাকে সযত্নে রক্ষা করা উচিত ছিল । পর্বতকে যদি মহম্মদের নিকট যাইতে নিষেধ কর , মহম্মদ যে পর্বতের কাছে আসে , তাহার উপায় কী । আমরা যেন ইংলণ্ডে না গেলাম , কিন্তু ইংরেজি শিক্ষা যে আমাদের গৃহে গৃহে আসিয়া প্রবেশ করিতেছে । বাঁধটা সে - ই তো ভাঙিয়াছে । আজ যে এত বাকচাতুরী , এত শাস্ত্রসন্ধানের ধূম পড়িয়াছে , মূলে আঘাত না পড়িলে তো তাহার কোনো আবশ্যক ছিল না ।

কিন্তু মূঢ় লোকাচার এমনি অন্ধ অথবা এমনি কপটাচারী যে , সে দিকে কোনো দৃক্‌পাত নাই । অতি - বড়ো পবিত্র হিন্দুও শৈশব হইতে আপন পুত্রকে ইংরেজি শিখাইতেছে ; এমন - কি , মাতৃভাষা শিখাইতেছে না ; এবং শিক্ষাসমিতি - সভায় যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাতৃভাষাশিক্ষার প্রস্তাব উঠিতেছে , তখন স্বদেশের লোকেই তো তাহাতে প্রধান আপত্তি করিতেছে ।

কেরানীগিরি না করিলে যে উদরপূর্ণ হয় না । পাস করিতেই হইবে । পাস না করিলে চাকরি চুলায় যাক , বিবাহ করা দুঃসাধ্য হইয়াছে । ইংরেজি - শিক্ষার মর্যাদা দেশের আপামর সাধারণের মধ্যে এমনি বদ্ধমূল হইয়াছে ।

কিন্তু এ কী ভ্রম , এ কী দুরাশা । ইংরেজি - শিক্ষাতে কেবলমাত্র যতটুকু কেরানীগিরির সহায়তা করিবে ততটুকু আমরা গ্রহণ করিব , বাকিটুকু আমাদের অন্তরে প্রবেশলাভ করিবে না । এ কি কখনো সম্ভব হয় । দীপশিখা কেবল যে আলো দেয় তাহা নহে ; পলিতাটুকুও পোড়ায় , তেলটুকুও শেষ করে । ইংরেজি - শিক্ষা কেবল যে মোটা মোটা চাকরি দেয় তাহা নহে , আমাদের লোকাচারের আবহমান সূত্রগুলিকেও পলে পলে দগ্ধ করিয়া ফেলে ।

এখন যতদিন এই শিক্ষা চলিবে এবং ইহার উপর আমাদের জীবিকানির্বাহ নির্ভর করিবে , ততদিন যিনি যেমন তর্ক করুন , শাস্ত্র মৃতভাষায় যতই নিষেধ ও বিভীষিকা প্রচার করুক , বাঙালি সমুদ্র পার হইবে , পৃথিবীর সমস্ত উন্নতিপথের যাত্রীদের সঙ্গ ধরিয়া একত্রে যাত্রা করিতে প্রাণপণে চেষ্টা করিবে ।