বিষয়বস্তুতে চলুন

চাঁদের পাহাড়/ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে


ছয়

 দিন পনেরো পরে শঙ্কর ও আলভারেজ্ উজিজি বন্দর থেকে ষ্টীমারে টাঙ্গানিয়াকা হ্রদে ভাস্‌ল। হ্রদ পার হয়ে আলবার্টভিল বলে একটা ছোট সহরে কিছু আবশ্যকীয় জিনিষ কিনে নিল। এই সহর থেকে কাবালো পর্য্যন্ত বেলজিয়ম গভর্ণমেণ্টের রেলপথ আছে। সেখান থেকে কঙ্গো নদীতে ষ্টীমারে চড়ে তিনদিনের পথ সান্‌কিনি যেতে হবে, সান্‌কিনিতে নেমে কঙ্গো নদীর পথ ছেড়ে, দক্ষিণ মুখে অজ্ঞাত বনজঙ্গল ও মরুভূমির দেশে প্রবেশ করতে হবে।

 কাবালো অতি অপরিষ্কার স্থান, কতকগুলো বর্ণসঙ্কর পর্টুগিজ ও বেলজিয়ানের আড্ডা।

 ষ্টেশনের বাইরে পা দিয়েচে এমন সময় একজন পর্টুগিজ ওর কাছে এসে বল্লে—হ্যালো, কোথায় যাবে? দেখচি নতুন লোক, আমায় চেনো না নিশ্চয়ই। আমার নাম আলবুকার্ক।

 শঙ্কর চেয়ে দেখলে আলভারেজ তখনও ষ্টেশনের মধ্যে।

 লোকটার চেহারা যেমন কর্কশ তেমনি কদাকার। কিন্তু সে ভীষণ জোয়ান, প্রায় সাত ফুটের কাছাকাছি লম্বা, শরীরের প্রত্যেকটি মাংসপেশী গুণে নেওয়া যায়, এমন সুদৃঢ় ও সুগঠিত

 শঙ্কর বল্লে—তোমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে সুখী হলাম।

 লোকটা বল্লে—তুমি দেখছি কালা আদমি, বোধহয় ইষ্ট ইণ্ডিজের। আমার সঙ্গে পোকার খেলবে চলো।  শঙ্কর ওর কথা শুনে চটেছিল, বল্লে—তোমার সঙ্গে পোকার খেলবার আমার আগ্রহ নেই। সঙ্গে সঙ্গে সে এটাও বুঝলে, লোকটা পোকার খেলবার ছলে তার সর্ব্বস্ব অপহরণ করতে চায়। পোকার একরকম তাসের জুয়াখেলা—শঙ্কর নাম জানলেও সে খেলা জীবনে কখনো দেখেওনি, নাইরোবিতে সে জানতো বদমাইশ জুয়াড়িরা পোকার খেলবার ছল করে নতুন লোকের সর্ব্বনাশ করে। এটা এক ধরণের ডাকাতি।

 শঙ্করের উত্তর শুনে পর্টুগিজ বদ্‌মাইসটা রেগে লাল হয়ে উঠ্‌ল। তার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বেরুতে চাইল। সে আরও কাছে ঘেঁষে এসে, দাঁতে দাঁত চেপে, অতি বিকৃত সুরে বললে—কী? নিগার, কি বল্লি? ইষ্ট ইণ্ডিজের তুলনায় তুই অত্যন্ত ফাজিল দেখচি! তোর ভবিষ্যতের মঙ্গলের জন্যে তোকে জানিয়ে দিই যে, তোর মতো কালা আদমিকে আল্‌বুকার্ক এই রিভল্‌ভারের গুলিতে কাদাখোঁচা পাখির মতো ডজনে ডজনে মেরেচে। আমার নিয়ম হচ্চে এই শোন্। কাবালোতে যারা নতুন লোক নামবে, তারা হয় আমার সঙ্গে পোকার খেলবে, নয়তো আমার সঙ্গে রিভলভারে দ্বন্দ্বযুদ্ধ করবে।

 শঙ্কর দেখলে এই বদমাইস লোকটার সঙ্গে রিভলভারের লড়াইয়ে নামলে মৃত্যু অনিবার্য্য। বদ্‌মাইসটা হচ্চে একজন ক্র্যাক্‌-শট্ গুণ্ডা, আর সে কি? কাল পর্য্যন্ত রেলের নিরীহ কেরাণী ছিল। কিন্তু যুদ্ধ না করে যদি পোকারই খেলে তবে সর্ব্বস্ব যাবে।

হয়তো আধমিনিট কাল শঙ্করের দেরী হয়েচে উত্তর দিতে, লোকটা কোমরের চামড়ার হোলষ্টার্ থেকে নিমেষের মধ্যে রিভলভার বার করে শঙ্করের পেটের কাছে উঁচিয়ে বল্লে—যুদ্ধ না পোকার?

শঙ্করের মাথায় রক্ত উঠে গেল। ভীতুর মতো সে পাশবিক শক্তির কাছে মাথা নীচু করবে না, হোক্ মৃত্যু।

সে বলতে যাচ্চে—যুদ্ধ, এমন সময় পিছন থেকে ভয়ানক বাজখাঁই সুরে কে বল্লে—এই! সাম্‌লাও, গুলিতে মাথার চাঁদি উড়্‌ল! দু’জনেই চমকে উঠে পিছনে চাইলে। আলভারেজ তার উইন্‌চেষ্টার রিপিটারটা বাগিয়ে, উঁচিয়ে, পর্টুগিজ বদ্‌মাইসটার মাথা লক্ষ্য করে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে। শঙ্কর সুযোগ বুঝে চট করে পিস্তলের নলের উল্টোদিকে ঘুরে গেল। আলভারেজ বল্লে—বালকের সঙ্গে রিভলভার ডুয়েল? ছোঃ, তিন বলতে পিস্তল ফেলে দিবি—এক,—দুই,—তিন—আল্‌বুকার্কের শিথিল হাত থেকে পিস্তলটা মাটীতে পড়ে গেল।

আলভারেজ্ বল্লে—বালককে একা পেয়ে খুব বীরত্ব জাহির করছিলি না? শঙ্কর ততক্ষণে পিস্তলটা মাটী থেকে কুড়িয়ে নিয়েচে। আলবুকার্ক একটু বিস্মিত হোল, আল্‌ভারেজ যে শঙ্করের দলের লোক, তা সে ভাবেওনি। সে হেসে বল্লে—আচ্ছা, মেট, কিছু মনে কোরো না, আমারই হার। দাও, আমার পিস্তলটা দাও ছোক্‌রা। কোনো ভয় নেই, দাও। এসো হাতে হাত দাও। তুমিও মেট্। আলবুকার্ক রাগ পুষে রাখে না। এসো, কাছেই আমার কেবিন, এক এক গ্লাস বিয়ার খেয়ে যাও।

 আল্‌ভারেজ নিজের জাতের লোকের রক্ত চেনে। ও নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে শঙ্করকে সঙ্গে নিয়ে আল্‌বুকার্কের কেবিনে গেল। শঙ্কর বিয়ার খায় না শুনে তাকে কফি করে দিলে। প্রাণখোলা হাসি হেসে কত গল্প করলে, যেন কিছুই হয় নি।

 শঙ্কর বাস্তবিকই লোকটার দিকে আকৃষ্ট হোল। কিছুক্ষণ আগের অপমান ও শত্রুতা যে এমন বেমালুম ভুলে গিয়ে, যাদের হাতে অপমানিত হয়েচে, তাদেরই সঙ্গে এমনি ধারা দিল-খোলা হেসে খোসগল্প করতে পারে, পৃথিবীতে এ ধরনের লোক বেশি নেই।


 পরদিন ওরা কাবালো থেকে ষ্টিমারে উঠল কঙ্গোনদী বেয়ে দক্ষিণ মুখে যাবার জন্যে। নদীর দুই তীরের দৃশ্যে শঙ্করের মন আনন্দে উত্‍ফুল্ল হয়ে উঠল।

 এ রকম অদ্ভুত বনজঙ্গলের দৃশ্য জীবনে কখনো সে দেখেনি। এতদিন সে যেখানে ছিল—আফ্রিকার সে অঞ্চলে এমন বন নেই, সে শুধু বিস্তীর্ণ প্রান্তর, প্রধানতঃ ঘাসের বন, মাঝে মাঝে বাবলা ও ইউকা গাছ। কিন্তু কঙ্গোনদী বেয়ে ষ্টীমার যত অগ্রসর হয়, দুধারে নিবিড় বনানী, কত ধরণের মোটা মোটা লতা, বনের ফুল, বন্যপ্রকৃতি এখানে আত্মহারা, লীলাময়ী, আপনার সৌন্দর্য্য ও নিবিড় প্রাচুর্য্যে আপনি মুগ্ধ।

 শঙ্করের মধ্যে যে সৌন্দর্য্যপ্রিয় ভাবুক মনটী ছিল, (হাজার হোক্‌ সে বাংলার মাটীর ছেলে, ডিয়েগো আল্‌ভারেজর মত শুধু কঠিন প্রান স্বর্ণান্বেষী প্রস্‌পেক্টর নয়) এই রূপের মেলায় সে মুগ্ধ ও বিস্মিত হয়ে রাঙা অপরাহ্নে ও দুপুর রোদে আপন মনে কত কি স্বপ্নজাল রচনা করে।

 অনেক রাত্রে সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, অচেনা তারাভরা বিদেশের আকাশের তলায় রহস্যময়ী বন্য প্রকৃতি তখন যেন জেগে উঠেচে—জঙ্গলের দিক থেকে কত বন্যজন্তুর ডাক কানে আসে, শঙ্করের চোখে ঘুম নেই, এই সৌন্দর্য বিভোর হয়ে, মধ্য আফ্রিকার নৈশ শীতলাকে তুচ্ছ করেও জেগে বসে থাকে।

 ঐ জ্বলজ্বলে সপ্তর্ষিমণ্ডল—আকাশে অনেকদূরে তার ছোট্ট গ্রামের মাথায়ও আজ এমনি সপ্তর্ষিমণ্ডল ঊঠেছে, ওই রকম এক ফালি কৃষ্ণপক্ষের গভীর রাত্রির চাঁদও। সে সব পরিচিত আকাশ ছেড়ে কতদূরে তাকে যেতে হবে, কি এর পরিণতি কে জানে?

 দুদিন পরে বোট এসে সান্‌কিনি পৌছুলো। সেখান থেকে ওরা আবার পদব্রজে রওনা হোল—জঙ্গল এদিকে বেশী নেই, কিন্তু দিগন্তপ্রসারী জনমানবহীন প্রান্তর ও অসংখ্য ছোট বড় পাহাড়, অধিকাংশ পাহাড় রুক্ষ ও বৃক্ষশূন্য, কোনো কোনো পাহাড়ে ইউফোর্বিয়া জাতীয় গাছের ঝোপ। কিন্তু শঙ্করের মনে হোল, আফ্রিকার এই অঞ্চলের দৃশ্য বড় অপ্রূপ। এতটা ফাঁকা জায়গা পেয়ে মন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, সূর্য্যাস্তের রঙ্‌, জ্যোৎস্নারাত্রির মায়া, এই দেশকে রাত্রে, অপরাহ্ণে রূপকথার পরীরাজ্য করে তোলে।

 আল্ভারেজ্ বল্লে—এই ভেল্ড্ অঞ্চলে সব জায়গা দেখতে একরকম বলে পথ হারাবার সম্ভাবনা কিন্তু খুব বেশী।

 কথাটা যেদিন বলা হোল, সেদিনই এক কাণ্ড ঘটল। জনহীন ভেল্ডে সূর্য্য অস্ত গেলে ওরা একটা ছোট পাহাড়ের আড়ালে তাঁবু খাটিয়ে আগুন জ্বাললে—শঙ্কর জল খুঁজতে বেরুল। সঙ্গে আল্‌ভারেজের বন্দুকটা নিয়ে গেল, কিন্তু মাত্র দুটী টোটা। আধঘণ্টা এদিক ওদিক ঘুরে বেলাটুকু গেল, পাৎলা অন্ধকারে সমস্ত প্রান্তরকে ধীরে ধীরে আবৃত করে দিলে। শঙ্কর শপথ করে বলতে পারে, সে আধঘণ্টার বেশী হাঁটেনি। হঠাৎ চারিধারে চেয়ে শঙ্করের কেমন একটা অস্বস্তি বোধ হোল, যেন কি একটী বিপদ বিপদ আসচে, তাঁবুতে ফেরা ভালো। দূরে দূরে ছোট বড় পাহাড়, একই রকম দেখতে সব দিক, কোনো চিহ্ন নেঈ, সব একাকার!

 মিনিট পাঁচ ছয় হাঁটবার পরই শঙ্করের মনে হোল সে পথ হারিয়েছে। তখন আল্‌ভারেজের কথা তার মনে পড়ল। কিন্তু তখনও সে অনভিজ্ঞতার দরুন বিপদের গুরুত্বটা বুঝতে পারলে না। হেঁটেই যাচ্ছে,হেঁটেই যাচ্ছে—একবার মনে হয় সামনে, একবার মনে হয় বাঁয়ে, একবার মনে হয় ডাইনে। তাঁবুর আগুনের কুণ্ডটা দেখা যায় না কেন? কোথায় সেই ছোট পাহাড়টা?

 দু’ঘণ্টা হাঁটবার পরে শঙ্করের খুব ভয় হোল। ততক্ষণে সে বুঝেচে যে, সে সম্পূর্ণরূপে পথ হারিয়েছে এবং ভয়ানক বিপদগ্রস্ত। একা তাকে রোডেসিয়ার এই জনমানবশূন্য, সিংহসঙ্কুল অজানা প্রান্তরে রাত কাটাতে হবে,—অনাহারে এবং এই কন্‌কনে শীতে বিনা কম্বলে ও বিনা আগুনে। সঙ্গে একটা দেশলাই পর্য্যন্ত নেই।

 ব্যাপারটা সংক্ষেপে এই দাঁড়ালো যে, পরদিন সন্ধ্যার পূর্ব্বে অর্থাৎ পথ হারানোর চব্বিশ ঘণ্টা পরে উদ্‌ভ্রান্ত তৃষ্ণায় মুমূর্ষু শঙ্করকে, ওদের তাঁবু থেকে প্রায় সাত মাইল দূরে, একটা ইউফোর্বিয়া গাছের তলা থেকে আল্‌ভারেজ উদ্ধার করে তাঁবুতে নিয়ে এল।

 আল্‌ভারেজ বল্লে—তুমি যে পথ ধরেছিলে শঙ্কর, তোমাকে আজ খুঁজে বার করতে না পারলে তুমি গভীর থেকে গভীরতর মরুপ্রান্তরের মধ্যে গিয়ে পড়ে, কাল দুপুর নাগাদ তৃষ্ণায় প্রাণ হারাতে। এর আগে তোমার মত অনেকেই রোডেসিয়ার ভেল্ডে এ ভাবে মারা গিয়েছে। এ সব ভয়ানক জায়গা। তুমি আর কখনও তাঁবু থেকে ও রকম বেরিও না, কারণ তুমি আনাড়ি। মরুভূমিতে ভ্রমণের কৌশল তোমার জানা নেই। ডাঁহা মারা পড়বে।

 শঙ্কর বল্লে—আলভারেজ, তুমি দু’বার আমার প্রাণ রক্ষা করলে, এ আমি ভুলবো না।

 আল্‌ভারেজ বল্লে—ইয়াং ম্যান, ভুলে যাচ্চ যে তার আগে তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ। তুমি না থাকলে ইউগাণ্ডার তৃণভূমিতে আমার হাড়গুলো শাদা হয়ে আসতো এতদিন।

 মাস দুই ধরে রোডেসিয়া ও এঙ্গোলার মধ্যবর্ত্তী বিস্তীর্ণ ভেল্ড্‌ অতিক্রম করে, অবশেষে দূরে মেঘের মত পর্ব্বতশ্রেণী দেখা গেল। আলভারেজ ম্যাপ মিলিয়ে বল্ল—ওই হচ্চে আমাদের গন্তব্যস্থান, রিখটারস্‌ভেল্ড্‌ পর্ব্বত, এখনও এখান থেকে চল্লিশ মাইল হবে। আফ্রিকার এই সব খোলা জায়গায় অনেক দূর থেকে জিনিস দেখা যায়।

 এ অঞ্চলে অনেক বাওবাব্ গাছ। শঙ্করের এ গাছ বড় ভাল লাগে—দূর থেকে যেন মনে হয় বট কি অশ্ব‌থ্থ‌ গাছের মত কিন্তু কাছে গেলে দেখা, বাওবাব গাছ ছায়াবিরল অথচ বিশাল, আঁকা বাঁকা, সারা গায়ে যেন বড় বড় আচিল কি আব্‌ বেরিয়েছে, যেন আরব্য উপন্যাসের একটা বেঁটে, কুদর্শন, কুব্জ দৈত্য। বিস্তীর্ণ প্রান্তরে এখানে ওখানে প্রায় সর্ব্বত্রই দূরে নিকটে বড় বড় বাওবাব্‌ গাছ দাঁড়িয়ে।

একদিন সন্ধ্যাবেলার দুর্জ্জয় শীতে তাঁবুর সামনে আগুন করে বসে আল্‌ভারেজ বল্‌লে—এই যে দেখ্‌চ, রোডেসিয়ার ভেল্ড্‌ অঞ্চল, এখানে হীরে ছড়ানো আছে সর্ব্বত্র, এটা হীরের খনির দেশ। কিম্বার্লি খনির নাম নিশ্চয়ই শুনেচ। আরও অনেক ছোট খাটো খনি আছে, এখানে ওখানে ছোট বড় হীরের টুক্‌রো কত লোকে পেয়েছে, এখনও পায়।

 কথা শেষ করেই বলে উঠ্‌ল—ও কারা?

 শঙ্কর সামনে বসে ওর কথা শুন্‌ছিল। বল্লে, কোথায় কে?

 কিন্তু আল্‌ভারেজের তীক্ষ্ণদৃষ্টি তার হাতের বন্দুকের গুলির মতই অব্যর্থ‌, একটু পরে তাঁবু থেকে দূরে অন্ধকারে কয়েকটী অস্পষ্ট মূর্ত্তি এদিকে এগিয়ে আসচে, শঙ্করের চোখে পড়ল। আল্‌ভারেজ বল্লে—শঙ্কর, বন্দুক নিয়ে এসো, চট্ করে যাও, টোটা ভরে—

 বন্দুক হাতে শঙ্কর বাইরে এসে দেখলে, আলভারেজ্ নিশ্চিন্ত মনে ধূমপান করচে, কিছুদূরে অজানা মূর্ত্তি কয়টী এখনও অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে আসচে। একটু পরে তারা এসে তাঁবুর অগ্নিকুণ্ডের বাইরে দাঁড়ালো। শঙ্কর চেয়ে দেখলে আগন্তুক কয়েকটী কৃষ্ণবর্ণ, দীর্ঘকায়,—তাদের হাতে কিছু নেই, পরণে লেংটি, গলায় সিংহের লোম, মাথায় পালক— সুগঠিত চেহারা, তাঁবুর আলোয় মনে হচ্ছিল, যেন কয়েকটী ব্রোঞ্জের মূর্ত্তি।

 আল্‌ভারেজ জুলু ভাষায় বল্লে—কি চাও তোমরা?

 ওদের মধ্যে কি কথাবার্ত্তা চল্‌ল, তার পরে ওরা সব মাটীর ওপর বসে পড়ল; আল্‌ভারেজ বল্লে—শঙ্কর ওদের খেতে দাও—

 তারপরে অনুচ্চস্বরে বল্লে—বড় বিপদ। খুব হুঁসিয়ার শঙ্কর।

 টিনের খাবার খোলা হোল। সকলের সামনেই খাবার রাখলে শঙ্কর। আল্‌ভারেজও ওই সঙ্গে আবার খেতে বস্‌লো, যদিও সে ও শঙ্কর সন্ধ্যার সময়েই তাদের নৈশ আহার শেষ করেচে। শঙ্কর বুঝলে আলভারেজের কোন মতলব আছে, কিংবা এদেশের রীতি অতিথির সঙ্গে খেতে হয়।

 আলভারেজ খেতে খেতে জুলু ভাষায় আগন্তুকদের সঙ্গে গল্প করচে, অনেকক্ষণ পরে খাওয়া শেষ করে ওরা চলে গেল। চলে যাবার আগে সবাইকে একটা করে সিগারেট দেওয়া হোল।

 ওরা চলে গেলে আল্‌ভারেজ বল্লে—ওরা মাটাবেল্‌ জাতির লোক। ভয়ানক দুর্দান্ত, ব্রিটিশ গবর্ণমেণ্টের সঙ্গে অনেকবার লড়েচে। সয়তানকেও ভয় করে না। ওরা সন্দেহ করেচে আমরা ওদের দেশে এসেচি হীরের খনির সন্ধানে। আমরা যে জায়গাটায় আছি, এটা ওদের একজন সর্দ্দারের রাজ্য। কোনো সভ্য গবর্ণমেণ্টের আইন এখানে খাট্‌বে না। ধরবে আর নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে মারবে। চলো আমরা তাঁবু তুলে রওনা হই।

 শঙ্কর বল্লে—তবে তুমি বন্দুক আনতে বল্লে কেন?

 আলভারেজ হেসে বল্লে—দেখো, ভেবেছিলুম যদি ওরা খেয়েও না ভোলে, কিংবা কথাবার্তায় বুঝতে পারি যে, ওদের মতলব খারাপ, ভোজনরত অবস্থাতেই ওদের গুলি করবো। এই দ্যাখো রিভলভার পেছনে রেখে তবে খেতে বসেছিলাম। এ কটাকে সাবাড় করে দিতাম। আমার নাম আল্‌ভারেজ্, অমিও একসময়ে সয়তানকেও ভয় করতুম না, এখনও করিনে। ওদের হাতের মাছ মুখে পৌছোবার আগেই আমার পিস্তলের গুলি ওদের মাথার খুলি উড়িয়ে দিত।

 আরও পাঁচ ছ’দিন পথ চলবার পরে একটা খুব বড় পর্ব্বতের পাদমূলের নিবিড় ট্রপিক্যাল অরণ্যানীর মধ্যে ওরা প্রবেশ করলে। স্থানটী যেমন নির্জ্জন, তেমনি বিশাল। সে বন দেখে শঙ্করের মনে হোল, একবার যদি সে এর মধ্যে পথ হারায়, সারাজীবন ঘুরলেও বার হয়ে আসবার সাধ্য তার হবে না। আলভারেজও তাকে সাবধান করে দিয়ে বল্লে—খুব হুঁসিয়ার শঙ্কর, বনে চলাফেরা যার অভ্যেস নেই, সে পদে পদে এই সব বনে পথ হারাবে। অনেক লোক বেঘোরে পড়ে বনের মধ্যে মারা পড়ে। মরুভূমির মধ্যে যেমন পথ হারিয়ে ঘুরেছিলে, এর মধ্যেও ঠিক তেমনিই পথ হারিয়ে ঘুরেছিলে, এর মধ্যেও ঠিক তেমনিই পথ হারিয়ে ঘুরেছিলে, এর মধ্যেও ঠিক তেমনিই পথ হারাতে পারো। কারণ এখানে সবই একরকম, এক জায়গা থেকে আর এক জায়গাকে পৃথক করে চিনে নেবার কোনো চিহ্ন নেই। ভাল বুশ্‌ম্যান না হোলে পদে পদে বিপদে পড়তে হবে। বন্দুক না নিয়ে এক পা কোথাও যাবে না, এটীও যেন মনে থাকে। মধ্য আফ্রিকার বন সৌখীন ভ্রমণের পার্ক নয়।

 শঙ্করকে তা না বল্লেও চলতো, কারণ এ সব অঞ্চল যে সখের পার্ক নয়, তা এর চেহারা দেখেই সে বুঝতে পেরেচে। সে জিজ্ঞেস্‌ করলে—তোমার সেই হলদে হীরের খনি কতদূরে? এই তো রিখ্‌টারস্‌ভেল্ড্‌ পর্ব্বতমালা, ম্যাপে যতদূর বোঝা যাচ্ছে।

 আল্‌ভারেজ হেসে বল্লে—তোমার ধারণা নেই বল্লাম যে। আসল রিখ্‌টারস্‌ভেল্ডের এটা বাইরের থাক্‌। এ রকম আরও অনেক থাক্‌ আছে। সমস্ত অঞ্চলটা এত বিশাল যে পূবে সত্তর মাইল ও পশ্চিমদিকে একশো থেকে দেড়শো মাইল পর্য্যন্ত গেলেও এ বন ও পাহাড় শেষ হবে না। সর্ব্ব নিম্ন প্রস্ত চল্লিশ মাইল। সমস্ত জড়িয়ে আট ন’ হাজার বর্গ মাইল সমস্ত রিখ্‌টারস্‌ভেল্ড্‌ পার্ব্বত্য অঞ্চল ও অরণ্য। এই বিশাল অজানা অঞ্চলের কোন্‌ খানটাতে এসেছিলুম আজ সাত আট বছর আগে, ঠিক সে জায়গাটা খুঁজে বার করা কি ছেলেখেলা, ইয়্যাং ম্যান্‌?

 শঙ্কর বল্লে—এদিকে খাবার ফুরিয়েচে, শিকারের ব্যবস্থা দেখতে হয়, নইলে কাল থেকে বায়ুভক্ষণ ছাড়া উপায় নেই।

 আলভারেজ বল্‌লে—কিছু ভেবো না। দেখচো না গাছে গাছে বেবুনের মেলা? কিছু না মেলে বেবুনের দাপ্‌না ভাজা আর কফি দিয়ে দিব্যি ব্রেকফাষ্ট খাবো কাল থেকে। আজ আর নয়, তাঁবু ফেল, বিশ্রাম করা যাক।

 একটা বড় গাছের নীচে তাঁবু খাটিয়ে ওরা আগুন জ্বালালে। শঙ্কর রান্না করলে, আহারাদি শেষ করে যখন দুজনে আগুনের সামনে বসেছে, তখনও বেলা আছে।

 আলভারেজ কড়া তামাকের পাইপ টানতে টানতে বল্লে—জানো, শঙ্কর, আফ্রিকার এই সব অজানা অরণ্যে এখনও কত জানোয়ার আছে, যার খবর বিজ্ঞানশাস্ত্র রাখে না? খুব কম সভ্য মানুষ এখানে এসেছে। ওকাপি বলে যে জানোয়ার সে তো প্রথম দেখা গেল ১৯০০ সালে। এক ধরণের বুনো শূওর আছে, যা সাধারণ বুনো শূওরের প্রায় তিনগুণ বড় আকারের। ১৮৮৮ সালে মোজেস্ কাউলে, পৃথিবী পর্য্যটক ও বড় শিকারী, সর্ব্বপ্রথম ওই বুনো শূওরের সন্ধান পান বেলজিয়াম কঙ্গোর লুয়ালাবু অরণ্যের মধ্যে। তিনি বহু কষ্টে একটা শিকারও করেন এবং নিউইয়র্ক প্রাণীবিদ্যা সংক্রান্ত মিউজিয়মে উপহার দেন। বিখ্যাত রোডেসিয়ান্‌ মন্‌ষ্টারের নাম শুনেচ?

 শঙ্কর বল্লে—না, কি সেটা?

 —শোনো তবে। রোডেসিয়ার উত্তর সীমায় প্রকাণ্ড জলাভূমি আছে। ওদেশের অসভ্য জুলুদের মধ্যে অনেকেই এক অদ্ভুত ধরণের জানোয়ারকে এই জলাভূমিতে মাঝে মাঝে দেখেচে। ওরা বলে তার মাথা কুমীরের মত, গণ্ডারের মত তার শিং আছে, গলাটা অজগর সাপের মত লম্বা ও আঁসওয়ালা দেহটা জল হস্তীর মত, লেজটা কুমীরের মত। বিরাটদেহ এই জানোয়ারের প্রকৃতিও খুব হিংস্র। জল ছাড়া কখনো ডাঙায় এ জানোয়ারকে দেখা যায় নি। তবে এই সব অসভ্য দেশী লোকের অতিরঞ্জিত বিবরণ বিশ্বাস করা শক্ত।

 কিন্তু ১৮৮০ সালে জেমস মার্টিন বলে একজন প্রস্‌পেক্টর রোডেসিয়ার এই অঞ্চলে বহুদিন ঘুরেছিলেন সোণার সন্ধানে। মিঃ মার্টিন আগে জেনারেল ম্যাথিউসের এডিকং ছিলেন, নিজে একজন ভালো ভূতত্ব ও প্রাণীতত্ত্ববিদও ছিলেন। ইনি তাঁর ডায়েরীর মধ্যে রোডেসিয়ার এই অজ্ঞাত জানোয়ার দূর থেকে দেখেচেন বলে উল্লেখ করে গিয়েছেন। তিনিও বলেন, জানোয়ারটা আকৃতিতে প্রাগৈতিহাসিক যুগের ডাইনোসর জাতীয় সরীসৃপের মত ও বেজায় বড়। কিন্তু তিনি জোর করে কিছু বলতে পারেন নি, কারণ খুব ভোরের কুয়াসার মধ্যে কোভিরাণ্ডো হ্রদের সীমানায় জলাভূমিতে আবছায়া ভাবে তিনি জানোয়ারটাকে দেখেছিলেন। জানোয়ারটার ঘোড়ার চিঁহিঁ ডাকের মত ডাক শুনেই তাঁর সঙ্গের জুলু চাকরগুলো ঊর্দ্ধশ্বাসে পালাতে পালাতে বল্লে—সাহেব পালাও, পালাও, ডিঙ্গোনেক্! ডিঙ্গোনেক্! ডিঙ্গোনেক্ ঐ জানোয়ারটার জুলু নাম। দু’তিন বছরে এক আধবার দেখা দেয় কি না দেয়, কিন্তু সেটা এতই হিংস্র যে, তার আবির্ভাব সে দেশের লোকের পক্ষে ভীষণ ভয়ের ব্যাপার। মিঃ মার্টিন বলেন, তিনি তাঁর ৩০৩ টোটা গোটা দুই উপরি উপরি ছুঁড়েছিলেন জানোয়ারটার দিকে। অতদূর থেকে তাক হোল না, রাইফেলের আওয়াজে সেটা সম্ভবতঃ জলে ডুব দিলে।

 শঙ্কর বল্লে—তুমি কি করে জানলে এ সব? মার্টিনের ডায়েরী ছাপানো হয়েছিল নাকি?

 —না, অনেকদিন আগে বুলাওয়েও ক্রণিক্‌ল কাগজে মিঃ মার্টিনের এই ঘটনাটা বেরিয়েছিল। আমি তখন সবে এদেশে এসেছি। রোডেসিয়া অঞ্চলে আমিও প্রস্‌পেক্‌টিং করে বেড়াতুম বলে জানোয়ারটার বিবরণ আমাকে খুব আকৃষ্ট করে। কাগজখানা অনেকদিন আমার কাছে রেখেও দিয়েছিলুম। তারপর কোথায় হারিয়ে গেল। ওরাই নাম দিয়েছিল জানোয়ারটার রোডেসিয়ান্ মনষ্টার।

 শঙ্কর বল্লে, তুমি কোনো কিছু অদ্ভূত জানোয়ার দেখোনি?

 প্রশ্নটার সঙ্গে সঙ্গে একটা আশ্চর্য্য ব্যাপার ঘটল।

 তখন সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে নেমে এসেচে। সেই আবছায়া আলো অন্ধকারের মধ্যে শঙ্করের মনে হোল—হয়তো শঙ্করের ভুল হতে পারে—কিন্তু শঙ্করের মনে হয় সে দেখলে আল্‌ভারেজ, দুর্দ্ধ‌র্ষ ও নির্ভীক আল্‌ভারেজ, দুঁদে ও অব্যর্থলক্ষ্য আলভারেজ, ওর প্রশ্ন শুনে চমকে উঠলো—এবং—এবং সেইটাই সকলের চেয়ে আশ্চর্য্য—যেন পরক্ষণেই শিউরে উঠল।

 সঙ্গে সঙ্গে আল্‌ভারেজ যেন নিজের অজ্ঞাতসারেই চারি পাশের জনমানবহীন ঘন জঙ্গল ও রহস্যভরা দুরারোহ পর্ব্বতমালার দিকে একবার চেয়ে দেখলে কোন কথা বল্লে না। যেন এই পর্ব্বতজঙ্গলে বহুকাল পরে এসে অতীতের কোনো বিভীষিকাময়ী পুরাতন ঘটনা ওর স্মৃতিতে ভেসে উঠেচে—যে স্মৃতিটা ওর পক্ষে খুব প্রীতিকর নয়।

 আল্‌ভারেজ ভয় পেয়েচে!

 অবাক্! আল্ভারেজের ভয়! শঙ্কর ভাবতেও পারে না! কিন্তু সেই ভয়টা অলক্ষিতে এসে শঙ্করের মনেও চেপে বসলো। এই সম্পূর্ণ অজানা বিচিত্র রহস্যময়ী বনানী, এই বিরাট পর্ব্বত প্রাচীর যেন এক গভীর রহস্যকে যুগ যুগ ধরে গোপন করে আস্‌চে—যে বীর হও, যে নির্ভীক হও, এগিয়ে এসো সে—কিন্তু মৃত্যুপণে ক্রয় করতে হবে সে গহন রহস্যের সন্ধান। রিখ্‌টারস্‌ভেল্ড পর্ব্বতমালা ভারতবর্ষের দেবাত্মা নাগাধিরাজ হিমালয় নয়—এদেশের মাসাই, জুলু, মাটাবেল প্রভৃতি আদিম জাতির মতই ওর আত্মা নিষ্ঠুর, বর্বর, নরমাংসোলুপ। সে কাউকে রেহাই দেবে না।