ছেলেবেলা/৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

চাকরদের বড়োকর্তা ব্রজেশ্বর । ছোটোকর্তা যে ছিল তার নাম শ্যাম — বাড়ি যশোরে , খাঁটি পাড়াগেঁয়ে , ভাষা তার কলকাতায়ি নয় । সে বলত , তেনারা ওনারা , খাতি হবে , মুগির ডাল কুলির আম্বল । ‘ দোমানি ' ছিল তার আদরের ডাক । তার রঙ ছিল শ্যামবর্ণ , বড়ো বড়ো চোখ , তেল-চুক্‌চুকে লম্বা চুল , মজবুত দোহারা শরীর । তার স্বভাবে কড়া কিছুই ছিল না , মন ছিল সাদা । ছেলেদের ‘ পরে তার ছিল দরদ । তার কাছে আমরা ডাকাতের গল্প শুনতে পেতুম । তখন ভূতের ভয় যেমন মানুষের মন জুড়ে ছিল তেমনি ডাকাতের গল্প ছিল ঘরে ঘরে । ডাকাতি এখনো কম হয় না — খুনও হয় , জখমও হয় , লুঠও হয় , পুলিসও ঠিক লোককে ধরে না । কিন্তু এ হল খবর , এতে গল্পের মজা নেই । তখনকার ডাকাতি গল্পে উঠেছিল দানা বেঁধে , অনেকদিন পর্যন্ত মুখে মুখে চারিয়ে গেছে । আমরা যখন জন্মেছি তখনো এমন-সব লোক দেখা যেত যারা সমর্থ বয়সে ছিল ডাকাতের দলে । মস্ত মস্ত সব লাঠিয়াল , সঙ্গে সঙ্গে চলে লাঠিখেলার সাক‌্‍‌রেদ । তাদের নাম শুনলেই লোকে সেলাম করত । প্রায়ই ডাকাতি তখন গোঁয়ারের মতো নিছক খুনখারাবির ব্যাপার ছিল না । তাতে যেমন ছিল বুকের পাটা তেমনি দরাজ মন । এ দিকে ভদ্রলোকের ঘরেও লাঠি দিয়ে লাঠি ঠেকাবার আখড়া বসে গিয়েছিল । যারা নাম করেছিল ডাকাতরাও তাদের মানত ওস্তাদ বলে , এড়িয়ে চলত তাদের সীমানা । অনেক জমিদারের ডাকাতি ছিল ব্যাবসা । গল্প শুনেছি , সেই জাতের একজন দল বসিয়ে রেখেছিল নদীর মোহানায় । সেদিন অমাবস্যা , পুজোর রাত্তির , কালী কঙ্কালীর নামে মুণ্ড কেটে মন্দিরে যখন নিয়ে এল জমিদার কপাল চাপড়ে বললে , ‘ এ যে আমারই জামাই! '

আরও শোনা যেত রঘুডাকাত বিশুডাকাতের কথা । তারা আগে থাকতে খবর দিয়ে ডাকাতি করত , ইতরপনা করত না । দূর থেকে তাদের হাঁক শুনে পাড়ার রক্ত যেত হিম হয়ে । মেয়েদের গায়ে হাত দিতে তাদের ধর্মে ছিল মানা । একবার একজন মেয়ে খাঁড়া হাতে কালী সেজে উল্‌টে ডাকাতের কাছ থেকে প্রণামী আদায় করেছিল ।

আমাদের বাড়িতে একদিন ডাকাতের খেলা দেখানো হয়েছিল । মস্ত মস্ত কালো কালো জোয়ান সব , লম্বা লম্বা চুল । ঢেঁকিতে চাদর বেঁধে সেটা দাঁতে কামড়ে ধরে দিলে ঢেঁকিটা টপকিয়ে পিঠের দিকে । ঝাঁকড়া চুলে মানুষ দুলিয়ে লাগল ঘোরাতে । লম্বা লাঠির উপর ভর দিয়ে লাফিয়ে উঠল দোতলায় । একজনের দুই হাতের ফাঁক দিয়ে পাখির মতো সুট করে বেরিয়ে গেল । দশ-বিশ কোশ দূরে ডাকাতি সেরে সেই রাত্রেই ভালোমানুষের মতো ঘরে ফিরে এসে শুয়ে থাকা কেমন করে হতে পারে , তাও দেখালে । খুব বড়ো একজোড়া লাঠির মাঝখানে আড়-করা একটা করে পা রাখবার কাঠের টুকরো বাঁধা । এই লাঠিকে বলে রঙপা । দুই হাতে দুই লাঠির আগা ধরে সেই পাদানের উপর পা রেখে চললে এক পা ফেলা দশ পা ফেলার সামিল হত , ঘোড়ার চেয়ে দৌড় হত বেশি । ডাকাতি করবার মতলব যদিও মাথায় ছিল না তবু এক সময়ে এই রঙপায় চলার অভ্যাস তখনকার শান্তিনিকেতনে ছেলেদের মধ্যে চালাবার চেষ্টা করেছিলুম । ডাকাতি খেলার এই ছবি শ্যামের মুখের গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে কতবার সন্ধে কাটিয়েছি দু হাতে পাঁজর চেপে ধরে ।

ছুটির রবিবার । আগের সন্ধেবেলায় ঝিঁঝি ডাকছিল বাইরের দক্ষিণের বাগানের ঝোপে , গল্পটা ছিল রঘু ডাকাতের । ছায়া-কাঁপা ঘরে মিটমিটে আলোতে বুক করছিল ধুক ধুক । পরদিন ছুটির ফাঁকে পালকিতে চড়ে বসলুম । সেটা চলতে শুরু করল বিনা চলায় , উড়ো ঠিকানায় , গল্পের জালে জড়ানো মনটাকে ভয়ের স্বাদ দেবার জন্যে । নিঝুম অন্ধকারের নাড়িতে যেন তালে তালে বেজে উঠছে বেহারাগুলোর হাঁই হুই হাঁই হুই , গা করছে ছম ছম । ধূ ধূ করে মাঠ , বাতাস কাঁপে রোদ্দুরে । দূরে ঝিক ঝিক করে কালিদিঘির জল । চিক চিক করে বালি । ডাঙার উপর থেকে ঝুঁকে পড়েছে ফাটল-ধরা ঘাটের দিকে ডালপালা-ছড়ানো পাকুড় গাছ ।

গল্পের আতঙ্ক জমা হয়ে আছে না-জানা মাঠের গাছতলায় , ঘন বেতের ঝোপে । যত এগোচ্ছি দুর দুর করছে বুক । বাঁশের লাঠির আগা দুই-একটা দেখা যায় ঝোপের উপর দিকে । কাঁধ বদল করবে বেহারাগুলো ঐখানে । জল খাবে , ভিজে গামছা জড়াবে মাথায় । তার পরে ?

‘ রে রে রে রে রে রে! '