ছেলেবেলা/৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

তখনকার কালের সঙ্গে এখনকার কালের তফাত ঘটেছে এ কথা স্পষ্ট বুঝতে পারি যখন দেখতে পাই আজকাল বাড়ির ছাদে না আছে মানুষের আনাগোনা , না আছে ভূতপ্রেতের । পূর্বেই জানিয়েছি , অত্যন্ত বেশি লেখাপড়ার আবহাওয়ায় টিঁকতে না পেরে ব্রক্ষদৈত্য দিয়েছে দৌড় । ছাদের কার্নিসে তার আরামে পা রাখবার গুজব উঠে গিয়ে সেখানে এঁঠো আমের আঁঠি নিয়ে কাকেদের চলেছে ছেঁড়াছেঁড়ি । এ দিকে মানুষের বসতি আটক পড়েছে নীচের তলার চারকোনা দেয়ালের প্যাক্‌বাক্সে ।

মনে পড়ে বাড়ি-ভিতরের পাঁচিল-ঘেরা ছাদ । মা বসেছেন সন্ধেবেলায় মাদুর পেতে , তাঁর সঙ্গিনীরা চার দিকে ঘিরে বসে গল্প করছে । সেই গল্পে খাঁটি খবরের দরকার ছিল না । দরকার কেবল সময়-কাটানো । তখনকার দিনের সময় ভরতি করবার জন্যে নানা দামের নানা মালমসলার বরাদ্দ ছিল না । দিন ছিল না ঠাসবুনুনি করা , ছিল বড়ো-বড়ো-ফাঁক-ওয়ালা জালের মতো । পুরুষদের মজলিসেই হোক , আর মেয়েদের আসরেই হোক , গল্পগুজব হাসিতামাশা ছিল খুবই হালকা দামের । মায়ের সঙ্গিনীদের মধ্যে প্রধান ব্যক্তি ছিলেন ব্রজ আচার্জির বোন , যাঁকে আচার্জিনী বলে ডাকা হত , তিনি ছিলেন এ বৈঠকে দৈনিক খবর সরবরাহকরবার কাজে । প্রায় আনতেন রাজ্যির বিদকুটে খবর কুড়িয়ে কিংবা বানিয়ে । তাই নিয়ে গ্রহশান্তি-স্বস্ত্যয়নের হিসেব হত খুব ফলাও খরচার । এই সভায় আমি মাঝে মাঝে টাটকা পুঁথি-পড়া বিদ্যের আমদানি করেছি , শুনিয়েছি সূর্য পৃথিবী থেকে ন কোটি মাইল দূরে । ঋজুপাঠ দ্বিতীয় ভাগ থেকে স্বয়ং বাল্মীকি-রামায়ণের টুকরো আউড়ে দিয়েছি অনুস্বারবিসর্গ-সুদ্ধ ; মা জানতেন না তাঁর ছেলের উচ্চারণ কত খাঁটি , তবু তার বিদ্যের পাল্লা সূর্যের ন কোটি মাইল রাস্তা পেরিয়ে গিয়ে তাঁকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে । এ-সব শ্লোক স্বয়ং নারদমুনি ছাড়া আর কারও মুখে শোনা যেতে পারে , এ কথা কে জানত বলো ।

বাড়ি-ভিতরের এই ছাদটা ছিল আগাগোড়া মেয়েদের দখলে । ভাঁড়ারের সঙ্গে ছিল তার বোঝাপড়া । ওখানে রোদ পড়ত পুরোপুরি , জারক নেবুতে দিত জারিয়ে । ঐখানে মেয়েরা বসত পিতলের গামলা-ভরা কলাইবাঁটা নিয়ে । টিপে টিপে টপ্‌টপ্‌ করে বড়ি দিত চুল শুকোতে শুকোতে ; দাসীরা বাসি কাপড় কেচে মেলে দিয়ে যেত রোদ্দুরে । তখন অনেকটা হালকা ছিল ধোবার কাজ । কাঁচা আম ফালি করে কেটে কেটে আমসি শুকনো হত , ছোটো বড়ো নানা সাইজের নানাকাজ-করা কালো পাথরের ছাঁচে আমের রস থাকে থাকে জমিয়ে তোলা হত , রোদ-খাওয়া সরষের তেলে মজে উঠত ইঁচড়ের আচার । কেয়াখয়ের তৈরি হত সাবধানে , তার কথাটা আমার বেশি করে মনে রাখবার মানে আছে । যখন ইস্কুলের পণ্ডিতমশায় আমাকে জানিয়ে দিলেন আমাদের বাড়ির কেয়াখয়েরের নাম তাঁর শোনা আছে , অর্থ বুঝতে শক্ত ঠেকল না । যা তাঁর শোনা আছে সেটা তাঁর জানা চাই । তাই বাড়ির সুনাম বজায় রাখবার জন্য মাঝে মাঝে লুকিয়ে ছাদে উঠে দুটো-একটা কেয়াখয়ের — কী বলব — চুরি করতুম বলার চেয়ে বলা ভালো অপহরণ করতুম । কেননা রাজা-মহারাজারাও দরকার হলে , এমন-কি না হলেও , অপহরণ করে থাকেন আর যারা চুরি করে তাদের জেলে পাঠান , শূলে চড়ান । শীতের কাঁচা রৌদ্রে ছাদে বসে গল্প করতে করতে কাক তাড়াবার আর সময় কাটাবার একটা দায় ছিল মেয়েদের । বাড়িতে আমি ছিলুম একমাত্র দেওর , বউদিদির আমসত্ত্ব পাহারা , তা ছাড়া আরও পাঁচরকম খুচরো কাজের সাথি । পড়ে শোনাতুম ‘ বঙ্গাধিপ পরাজয় ' । কখনো কখনো আমার উপরে ভার পড়ত জাঁতি দিয়ে সুপুরি কাটবার । খুব সরু করে সুপুরি কাটতে পারতুম । আমার অন্য কোনো গুণ যে ছিল , সে কথা কিছুতেই বউঠাকরুন মানতেন না , এমন-কি চেহারারও খুঁত ধরে বিধাতার উপর রাগ ধরিয়ে দিতেন । কিন্তু আমার সুপুরি-কাটা হাতের গুণ বাড়িয়ে বলতে মুখে বাধত না । তাতে সুপুরি কাটার কাজটা চলত খুব দৌড়বেগে । উসকিয়ে দেবার লোক না থাকাতে সরু করে সুপুরি কাটার হাত অনেক দিন থেকে অন্য সরু কাজে লাগিয়েছি ।

ছাদে-মেলে-দেওয়া এই-সব মেয়েলি কাজে পাড়াগাঁয়ের একটা স্বাদ ছিল । এই কাজগুলো সেই সময়কার যখন বাড়িতে ছিল ঢেঁকিশাল , যখন হত নাড়ুকোটা , যখন দাসীরা সন্ধেবেলায় বসে উরুতের উপর সলতে পাকাত , আর প্রতিবেশীর ঘরে ডাক পড়ত আটকৌড়ির নেমন্তন্নে । রূপকথা আজকাল ছেলেরা মেয়েদের মুখ থেকে শুনতে পায় না , নিজে নিজে পড়ে ছাপানো বই থেকে । আচার চাটনি এখন কিনে আনতে হয় নতুনবাজার থেকে — বোতলে ভরা , গালা দিয়ে ছিপিতে বন্ধ ।

পাড়াগাঁয়ের আরও-একটা ছাপ ছিল চণ্ডীমণ্ডপে । ঐখানে গুরুমশায়ের পাঠশালা বসত । কেবল বাড়ির নয় , পাড়াপ্রতিবেশীর ছেলেদেরও ঐখানেই বিদ্যের প্রথম আঁচড় পড়ত তালপাতায় । আমিও নিশ্চয় ঐখানেই স্বরে-অ স্বরে-আর উপর দাগা বুলোতে আরম্ভ করেছিলুম , কিন্তু সৌরলোকের সবচেয়ে দূরের গ্রহের মতো সেই শিশুকে মনে-আনা-ওয়ালা কোনো দূরবীন দিয়েও তাকে দেখবার জো নেই ।

তার পরে বই পড়ার কথা প্রথম যা মনে পড়ে সে ষণ্ডামার্ক মুনির পাঠশালার বিষম ব্যাপার নিয়ে , আর হিরণ্যকশিপুর পেট চিরছে নৃসিংহ-অবতার — বোধ করি সীসের ফলকে খোদাই করা তার একখানা ছবিও দেখেছি সেই বইয়ে । আর মনে পড়ছে কিছু কিছু চাণক্যের শ্লোক ।

আমার জীবনে বাইরের খোলা ছাদ ছিল প্রধান ছুটির দেশ । ছোটো থেকে বড়ো বয়স পর্যন্ত আমার নানা রকমের দিন ঐ ছাদে নানা ভাবে বয়ে চলেছে । আমার পিতা যখন বাড়ি থাকতেন তাঁর জায়গা ছিল তেতালার ঘরে । চিলেকোঠার আড়ালে দাঁড়িয়ে দূর থেকে কতদিন দেখেছি , তখনো সূর্য ওঠে নি , তিনি সাদা পাথরের মূর্তির মতো ছাদে চুপ করে বসে আছেন , কোলে দুটি হাত জোড়-করা । মাঝে মাঝে তিনি অনেক দিনের জন্য চলে যেতেন পাহাড়ে পর্বতে , তখন ঐ ছাদে যাওয়া ছিল আমার সাত-সমুদ্দুর-পারে যাওয়ার আনন্দ । চিরদিনের নীচেতলায়বারান্দায় বসে বসে রেলিঙের ফাঁক দিয়ে দেখে এসেছি রাস্তার লোক-চলাচল ; কিন্তু ঐ ছাদের উপর যাওয়া লোকবসতির পিল্‌পেগাড়ি পেরিয়ে যাওয়া । ওখানে গেলে কলকাতার মাথার উপর দিয়ে পা ফেলে ফেলে মন চলে যায় যেখানে আকাশের শেষ নীল মিশে গেছে পৃথিবীর শেষ সবুজে । নানা বাড়ির নানা গড়নের উঁচুনিচু ছাদ চোখে ঠেকে , মধ্যে মধ্যে দেখা যায় গাছের ঝাঁকড়া মাথা । আমি লুকিয়ে ছাদে উঠতুম প্রায়ই দুপুর বেলায় । বরাবর এই দুপুর বেলাটা নিয়েছে আমার মন ভুলিয়ে । ও যেন দিনের বেলাকার রাত্তির , বালক সন্ন্যাসীর বিবাগি হয়ে যাবার সময় । খড়খড়ির ভিতর দিয়ে হাত গলিয়ে ঘরের ছিট্‌কিনি দিতুম খুলে । দরজার ঠিক সামনেই ছিল একটা সোফা ; সেইখানে অত্যন্ত একলা হয়ে বসতুম । আমাকে পাকড়া করবার চৌকিদার যারা , পেট ভরে খেয়ে তাদের ঝিমুনি এসেছে , গা মোড়া দিতে দিতে শুয়ে পড়েছে মাদুর জুড়ে ।

রাঙা হয়ে আসত রোদ্দুর , চিল ডেকে যেত আকাশে । সামনের গলি দিয়ে হেঁকে যেত চুড়িওয়ালা । সেদিনকার দুপুরবেলাকার সেই চুপচাপ বেলা আজ আর নেই , আর নেই সেই চুপচাপ বেলার ফেরিওয়ালা ।

হঠাৎ তাদের হাঁক পৌঁছত যেখানে বালিশের উপর খোলা চুল এলিয়ে দিয়ে শুয়ে থাকত বাড়ির বৌ , দাসী ডেকে নিয়ে আসত ভিতরে , বুড়ো চুড়িওয়ালা কচি হাত টিপে টিপে পরিয়ে দিত পছন্দমতো বেলোয়ারি চুড়ি । সেদিনকার সেই বৌ আজকের দিনে এখনো বৌএর পদ পায় নি , সেকেণ্ড্‌ ক্লাসে সে পড়া মুখস্থ করছে । আর সেই চুড়িওয়ালা হয়তো আজ সেই গলিতেই বেড়াচ্ছে রিক্‌শ ঠেলে । ছাদটা ছিল আমার কেতাবে-পড়া মরুভূমি , ধু ধু করছে চার দিক । গরম বাতাস হু হু করে ছুটে যাচ্ছে ধুলো উড়িয়ে , আকাশের নীল রঙ এসেছে ফিকে হয়ে ।

এই ছাদের মরুভূমিতে তখন একটা ওয়েসিস দেখা দিয়েছিল । আজকাল উপরের তলায় কলের জলের নাগাল নেই । তখন তেতালার ঘরেও তার দৌড় ছিল । লুকিয়ে-ঢোকা নাবার ঘর , তাকে যেন বাংলা দেশের শিশু লিভিংস্টন এইমাত্র খুঁজে বের করলে । কল দিতুম খুলে , ধারাজল পড়ত সকল গায়ে । বিছানার একখানা চাদর নিয়ে গা মুছে সহজ মানুষ হয়ে বসতুম ।

ছুটির দিনটা দেখতে দেখতে শেষের দিকে এসে পৌঁছল । নীচের দেউড়ির ঘণ্টায় বাজল চারটে । রবিবারের বিকেল বেলায় আকাশটা বিশ্রী রকমের মুখ বিগড়ে আছে । আসছে-সোমবারের হাঁ-করা মুখের গ্রহণ-লাগানো ছায়া তাকে গিলতে শুরু করেছে । নীচে এতক্ষণে পাহারা-এড়ানো ছেলের খোঁজ পড়ে গেছে ।

এখন জলখাবারের সময় । এইটে ছিল ব্রজেশ্বরের একটা লালচিহ্ন-দেওয়া দিনের ভাগ । জলখাবারের বাজার করা ছিল তারই জিম্মায় । তখনকার দিনে দোকানিরা ঘিয়ের দামে শতকরা ত্রিশ-চল্লিশ টাকা হারে মুনফা রাখত না , গন্ধে স্বাদে জলখাবার তখনো বিষিয়ে ওঠে নি । যদি জুটে যেত কচুরি সিঙাড়া , এমন-কি আলুর দম , সেটা মুখে পুরতে সময় লাগত না । কিন্তু যথাসময়ে ব্রজেশ্বর যখন তার বাঁকা ঘাড় আরও বাঁকিয়ে বলত ‘ দেখো বাবু আজ কী এনেছি ', প্রায় দেখা যেত কাগজের ঠোঙায় চীনেবাদাম-ভাজা! সেটাতে আমাদের যে রুচি ছিল না তা নয় , কিন্তু ওর দরের মধ্যেই ছিল ওর আদর । কোনোদিন টুঁ শব্দ করি নি । এমন-কি , যেদিন তালপাতার ঠোঙা থেকে বেরত তিলেগজা সেদিনও না ।

দিনের আলো আসছে ঘোলা হয়ে । মন খারাপ নিয়ে একবার ছাদটা ঘুরে আসা গেল , নীচের দিকে দেখলুম তাকিয়ে — পুকুর থেকে পাতিহাঁসগুলো উঠে গিয়েছে । লোকজনের আনাগোনা আরম্ভ হয়েছে ঘাটে , বটগাছের ছায়া পড়েছে অর্ধেক পুকুর জুড়ে , রাস্তা থেকে জুড়িগাড়ির সইসের হাঁক শোনা যাচ্ছে ।