ঝাঁশির রাণী/রাণীর দত্তক-গ্রহণ ও রাজ্যচ্যুতি

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


রাণীর দত্তক-গ্রহণ ও রাজ্যচ্যুতি।

 বিবাহ অনুষ্ঠানের সময় মনুবাইর প্রগৰ্ভতার একটু পরিচয় পাওয়া যায়। বিবাহের সময় নব-পরিণীত বধূ ও বরের পরস্পরের বস্ত্রাঞ্চলে গ্রন্থি বন্ধন করিবার রীতি আছে। তদনুসারে পুরোহিত গ্রন্থি বাঁধিবার উদ্যোগ করিলে, মনুবাই পুরোহিতকে বলিল “ভাল করিয়া দৃঢ়রূপে গ্ৰস্থিবন্ধন কর”—এই কথা শুনিয়া সেই সময়ে সকলে আশ্চর্যান্বিত হইয়াছিল।

 যাহা হউক, কালক্রমে রাণীর একটা পুত্র সন্তান হইল, কিন্তু দুর্ভাগ্য- ক্রমে, তিনমাসের মধ্যেই করাল কাল তাহাকে হরণ করিল। এই পুত্র- শোকের আঘাতে মহারাজ গঙ্গাধররাও রোগগ্রস্ত হইয়া, ক্রমে আসন্ন দশায় উপস্থিত হইলেন। এই সময়ে তিনি দত্তকগ্রহণেচ্ছু হইয়া স্বীয়বংশের বসুদেবরাও-নেবালকরের পুত্র আনন্দরাওকে, যথাবিধি দত্তক- বিধানানুসারে মহাসমারোহ-সহকারে, দত্তকপুত্ররূপে গ্রহণ করিলেন। পরে ইহার নাম, দামোদররাও-গঙ্গাধররাও রাখা হইল। মহারাজা, এই দত্তকগ্রহণ-সম্বন্ধীয় সমস্ত বৃত্তান্ত বুলেখণ্ডের পোলিটিক্যাল রেসিডেন্টের নিকট লিখিয়া পাঠাইলেন। অন্যান্য কথার মধ্যে, বংশপরম্পরাক্রমে ঝুঁশির মালিকী স্বত্ব বজায় থাকিবে বলিয়া তাহার পূর্বপুরুষ রামচন্দ্র- রাওর সহিত ইংরাজ-সরকারের কৃত সন্ধিপত্রে যে উল্লেখ ছিল, সে কথাও এই পত্রের মধ্যে একস্থলে সন্নিবেশিত হইয়াছিল। এইরূপে মহারাজা, স্বীয় উত্তরাধিকারের ব্যবস্থা করিয়া, নিশ্চিন্তমনে ইহলোক হইতে অপসৃত হইলেন। এদিকে, বুলেখণ্ডের পোলিটিক্যাল এজেন্ট, রাজার গৃহীত দত্তকপুত্র ঝাঁশির প্রকৃত উত্তরাধিকারী কি না এই বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করিয়া হিন্দুস্থানসরকারের নিকট স্বীয় মন্তব্য-লিপি লিখিয়া পাঠাইলেন। তাহার মধ্যে এইরূপ কথার সূচনা ছিল যে, আঁশি-রাজ্য খাস করিয়া লইবার অধিকার ব্রিটিশ-সরকারের আছে এবং এই অবসর ত্যাগ করা উচিত নহে। তবে, কঁশি খাস করিয়া লইলে, রাণীকে ৫০০০ টাকার মাসিক বৃত্তি দিলে ভাল হয় ইত্যাদি। যখন এই রিপোর্ট হিন্দুস্থান সরকারের নিকট প্রেরিত হয়, তখন লাট সাহেব ডালহৌসী অযোধ্যায় ভ্রমণ করিতে গিয়াছিলেন। সেই জন্য ছয়মাস কাল এই পত্রের কোন উত্তর আসে নাই। মহারাণী লক্ষ্মী বাইর সম্পূর্ণ আশা ভরসা ছিল যে, কৃপালু ব্রিটিশসরকার শ্রীমন্ত দামোদররাওর দত্তক-বিধান মঞ্জুর করিয়া তাহাকেই ঝাঁশির গদিতে স্থাপন করিবেন! এই সম্বন্ধে রাণী ঠাকুরাণীও হিন্দুস্থান সরকার-সমীপে এক পত্র প্রেরণ করেন। লর্ড ডালহৌসী ১৮৫৪ খৃষ্টাব্দে কলিকাতায় ফিরিয়া আসিলে পর, ইংরাজ সরকারের পররাষ্ট্রীয় সেক্রেটরি জে-পি-গ্রান্ট সাহেব ঝশি-রাজ্যের সমস্ত বৃত্তান্ত ও ইংরাজ-সরকারের সহিত তাহার কিরূপ সম্বন্ধ তাহার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লিখিয়া তাহার সম্মুখে অর্পণ করিলেন। এই রিপোর্টের মুখ্য তাৎপর্য, কঁশি-রাজ্য খাস করিয়া লওয়া। এই রিপোর্টের উপরেই ভর করিয়া লাটসাহেবস্বীয় আদেশ-মন্তব্য প্রচার করিলেন। তাহার স্থূল মর্ম্ম এই;—যেহেতু ঝঁশি স্বাধীন রাজ্য নহে—ইংরাজ সরকারের অধীনস্থ মালিক রাজ্য মাত্র, অতএব সার্বভৌম অধিপতি ব্রিটিশ-সরকারের অনুমতি-ব্যতীত মহারাজার দত্তক গ্রহণ করিবার অধিকার নাই। এবং যেহেতু গঙ্গাধর- রাওর যে সকল পূর্বপুরুষের সহিত ব্রিটিশ-সরকারের বাধ্যবাধকতা-সম্বন্ধ ছিল তাহাদের বংশের কোন সাক্ষাৎ উত্তরাধিকারী বর্তমান নাই, অতএব এই দত্তক-বিধান মঞ্জুর করিয়া কঁশির গদি স্থায়ী রাখিতে ব্রিটিশ-সরকার বাধ্য নহেন। এতদ্ব্যতীত ঝাশি-রাজ্য ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে ভুক্ত হইলে সমস্ত বুলেখণ্ডের রাজ্য-ব্যবস্থা সুচারুরূপে নির্বাহ হইবে এবং ব্রিটিশ সুশাসনে সমস্ত প্রজাবর্গেরও কল্যাণ হইবে।

 অতএব রাণীর জীবদ্দশা-পর্য্যন্ত তাহার ব্যয় নির্বাহার্থ ৫০০০ টাকার মাসিক বৃত্তি নির্ধারিত করিয়া ঝাঁশি-রাজ্য খাস করিয়া লওয়া হউক।

 প্রকৃত কথা লর্ড ডালহৌসী ভারতবর্ষে পদার্পণ করিয়াই যে সকল ক্ষুদ্র রাজ্য ও জাইগীর তখনও ব্রিটিশ সরকারের অধীন হয় নাই, তাহা- দিগকে যেন-তেন-প্রকারেণ ব্রিটিশরাজ্যভুক্ত করিবার জন্য তাহার ঐকান্তিক চেষ্টা হইয়াছিল। এই সর্ব্বগ্রাসী নীতি অবলম্বন করিলে বচন-ভঙ্গরূপ মহাপাতক হইবে এবং ইংরাজের শুভ্র যশে কলঙ্ক স্পর্শ করিবে—্ড্যুক অফ ওএলিংটন প্রভৃতি রাষ্ট্রনীতিপটু বিচক্ষণ ব্যক্তিগণ এই রূপ বারম্বার প্রতিপাদন করা-সত্ত্বেও লর্ড ডালহৌসী তাহাদিগের কথায় কর্ণপাত করিলেন না। তিনি প্রথমে, সাতারার ছত্রপতি শহাজি মহা- রাজের গৃহীত দত্তক নামঞ্জুর করিয়া সাতারা আত্মগ্লাস করিলেন। পরে। নাগপুর ও তাঞ্জোরের এই গতি হইল। অবশেষে ঝশি রাজ্যের উপর তাহার উদ্যত বজ্র সবেগে আসিয়া পড়িল।

 আজ হইতে ঝাঁশি-রাজ্য খাস হইল এই আদেশ-লিপি ও ঘোষণাপত্র লইয়া মেজর-এলিস-সাহেব রাজবাটীতে প্রবেশ করিলেন। দরবার- মহলে চীক-পর্দার অন্তরালে রাণী ঠাকুরাণীর সহিত তাহার ভেট হইল। এলিস-সাহেব ঘোষণাপত্র পড়িয়া শুনাইলেন এবং আপনাকে পূর্ণ পরি- মাণে বৃত্তি দেওয়া হইবে ও আপনার যথাযোগ্য মান-মৰ্য্যাদা পালিত হইবে” এই বলিয়া আশ্বাস দিলেন। কিন্তু কঁশি খাস করিয়া লওয়া হইল, এই দারুণবার্তা শুনিবামাত্র রাণী একেবারে বজ্রাহত হইলেন। ইহা দেখিয়া এলিস-সাহেব তাহাকে নানাপ্রকার সান্ত্বনা করিবার চেষ্টা করিয়া অবশেষে বিদায় প্রার্থনা করিলে, রাণী ঠাকুরাণীর সুমধুর কণ্ঠ হইতে এই করুণোক্তি সবেগে উচ্ছসিত হইল;—“মেরা ঝশি দেঙ্গা নেই!”

 ঝাঁশি ব্রিটিশ-রাজ্যভুক্ত হইয়া গেলে, বুলেখণ্ডের পোলিটিকেল এজেন্ট ম্যালকম-সাহেব, হিন্দুস্থান-সরকারের পররাষ্ট্রীয় সেক্রেটরিকে ঝাঁশির রাণী সম্বন্ধে কতকগুলি প্রস্তাব করিয়া এক মন্তব্য-লিপি লিখিয়া পাঠাইলেন। সেই প্রস্তাবগুলির স্থূল মৰ্ম্ম এই —(১) রাণীর জীবদ্দশা-পৰ্যন্ত রাণীকে ৫০০০ টাকা করিয়া মাসিক বৃত্তি দেওয়া হয়। (২) বাসের জন্য রাণীকে ঝুঁশির রাজবাটী অর্পণ করা হয়—এবং আরও বলিলেন, সেই রাজবাটী রাণীর নিজ সম্পত্তি, এইরূপ বুঝিতে হইবে। (৩) মহারাজা গঙ্গাধর-রাওর ইচ্ছানুসারে, রাজ্যের জহরৎ ও তহবিলের অবশিষ্ট নগদ টাকা, হিসাব করিয়া রাণী-সাহেবকে দেওয়া হয় এবং রাণীর যে সকল আত্মীয় কুটুম্ব আছে তাহাদিগের জন্য বৃত্তি নির্ধারণ করিয়া একটা তালিকা প্রস্তুত করা হয়। এই পত্রের উত্তরে লর্ড ডেলহৌসী তাহার মন্তব্য লিখিয়া পাঠাইলেন; এবং ম্যালকম-সাহেবের অন্যান্য প্রস্তাব গ্রাহ্য করিয়া কেবল এক বিষয়ে অনভিমত প্রকাশ করিলেন। তিনি বলিলেন, রাজ্যের জহরৎ ও নিজস্ব সম্পত্তি দত্তক পুত্রের প্রাপ্য, দত্তকপুত্র যাবৎ বয়ঃপ্রাপ্ত না হয় তাবৎ তাহা গচ্ছিত থাকিবে। আইনানুসারে রাজার গৃহীত দত্তকপুত্র রাজাধিকারী না হইলেও, মহা- রাজের নিজস্ব সম্পত্তির সে যে অধিকারী তাহাতে সন্দেহ নাই। এই পত্র পাইয়া ম্যালকম-সাহেব, কেল্লার অভ্যন্তরস্থ রাজবাটী হইতে জহরৎ ও নগদ তহবিলের টাকা উঠাইয়া আনিয়া সহরের রাজবাটাতে গিয়া রাণী ঠাকুরাণীর জিম্মা করিয়া দিলেন এবং রাণীকে সহরের রাজবাটা ছাড়িয়া দিয়া, কেল্লার রাজবাটী ও সমস্ত কেল্লা, ইংরাজ-সরকারের তরফে অধিকার করিলেন।

 এদিকে ব্রিটিশ-সরকারের ন্যায়নিষ্ঠার উপর রাণী-ঠাকুরাণীর অগাধ ‘বিশ্বাস থাকায়, তিনি এই সামান্য ৫০০০ টাকার বৃত্তি গ্রহণে অস্বীকৃত হইলেন এবং সমস্ত ঝাঁশি-রাজ্য যাহাতে পুনৰ্বার ফিরিয়া পান তজ্জন্য বিধিমতে উদ্যোগ করিতে লাগিলেন। তিনি উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় নামক একজন বাঙ্গালী ও আর একজন য়ুরোপীয়কে ৬০০০০ টাকা দিয়া এবং তৎসঙ্গে একটা দরখাস্ত দিয়া, বিলাতের কোর্ট অফ ডিরেক্টরের নিকট পাঠাইয়া দিলেন। এই দরখাস্তের মধ্যে, একস্থলে এইরূপ লেখা হয় যে, “ইংরাজ-সরকার আমাদিগকে ঝাঁশি-রাজ্য দান করেন নাই; পেশোয়ার রাজত্বকালে আমাদের পূর্বপুরুষেরা অনেক পরাক্রমের কাৰ্য্য করায়, তাহাদের নিজ বাহাদুরী-বলেই উহা অর্জন করিয়াছিলেন—অত- এব উহাতে ইংরাজ-সরকারের কোন অধিকার নাই।” এই দরখাস্ত লইয়া, ঐ দুই মোক্তার বিলাতে গিয়া যে কি করিলেন, তাহার বার্তা কিছুই জানা যায় না। নানাসাহেবের প্রেরিত মোক্তার আজিম-উল্লা-খা বিলাতে গিয়া মজা উড়াইয়া ও রুশীয় সৈন্যের সামিল হইয়া সিবাষ্টপুলের, লড়াই দেখিয়াছিলেন, এই মাত্র সংবাদ পাওয়া যায়, কিন্তু রাণী ঠাকুরাণীর প্রেরিত মোক্তারদিগের কোন সন্ধান পাওয়া যায় না। যাহা হউক, ইতিমধ্যে, কোর্ট-অ-ডাইরেক্টর, হিন্দুস্থান-সরকারের অবধারিত প্রস্তাবে পূর্ণ সম্মতি দিয়া, লাটসাহেবকে পত্র লিখিলেন। এদিকে রাণী ঠাকুরাণীর তখনও দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে তাহার মোক্তারের বিলাতে তাহার দাবী- সম্বন্ধে যথাসাধ্য আন্দোলন করিতেছে। উহা যে বৃথা আশা, অন্তঃপুর- চারিণী মহারাণী তখনও তাহা বুঝিতে পারেন নাই।

 ঝাঁশি ইংরাজের অধীন হইলে, শ্লীমান সাহেব আঁশির কমিশনর পদে প্রথম নিযুক্ত হইলেন। এইরূপে, ব্রিটিশ সরকারের মিত্র শিবরাও- ভাউর ঝাশি-রাজ্য তাহার উত্তরাধিকারীদিগের হস্ত হইতে চির-কালের মত বিচ্যুত হইল এবং

“ইদমেব নরেন্দ্রাণাং স্বর্গদ্বারমনৰ্গলং।
যদাত্মনঃ প্রতিজ্ঞা চ প্রজা চ পরিপাল্যতে।"

 এই নীতি সৰ্ব্বথা পরিপালিত না হওয়ায় পরিণামে কি বিষময় ফল উৎপন্ন হইল তাহা কে না জানে! ঝুঁশির এইরূপ শোচনীয় অবস্থা দেখিয়া, “আরাধনা-বলে সফল মেলে” রামদাস স্বামীর এই উক্তিতে রাণী কথঞ্চিৎ সান্ত্বনা অনুভব করিয়া স্বীয় অবশিষ্ট জীবিতকাল ঈশ্বরারা- ধনায় অতিবাহিত করিবেন, এইরূপ স্থির করিলেন। পতির পরলোক- প্রাপ্তির পর কিছু দিন পর্যন্ত তাহার নিতান্ত ঔদাস্য উপস্থিত হইয়াছিল। তিনি রাত্রি চারিটার সময় শয্যা হইতে গাত্রোত্থান করিয়া, স্নানাদি সমাধা। করিয়া আট ঘটিকা পর্যন্ত পূজার্চনা করিতেন। তদনন্তর পোষাক পরিয়া রাজবাটীর অঙ্গনে চার পাঁচটা ঘোড়া দৌড় করাইতেন, এগারটা বাজিলে নিত্যনিয়মিত দানক্রিয়া করিয়া আহার করিতেন। ভোজনের পর তিন ঘটিকা পর্যন্ত এক হাজার এক শত রামনাম কাগজে লিখিয়া মৎস্যদিগের নিকট নিক্ষেপ করিতেন। সায়ংকাল হইতে রাত্রি আট ঘটিকা পর্যন্ত পুরাণ শ্রবণ করিতেন এবং কেহ দেখা করিতে আসিলে দেখা করিতেন। পুরাণ-পাঠ শ্রবণান্তে পুনৰ্ব্বার স্নান করিয়া দেবপূজা করিতেন; প্রতি শুক্রবার উপবাস করিতেন ও সূৰ্যাস্তকালে শ্রীমহালক্ষ্মী দেবীর দর্শনে নির্গত হইতেন।

 ঋঁশি খাস করিয়া লইবার পর, রাজ্যের পুরাতন দরবারী লোক- দিগকে অবসর দেওয়া হয়, এই জন্য রাণী ঠাকুরাণীর পিতা মোরোপন্ত ও লক্ষ্মণ-রাও কেবল এই দুই ব্যক্তি রাণী ঠাকুরাণীর কাজকর্ম তত্ত্বাবধান করিতে আসিতেন। এক্ষণে রাজবাটার সমস্ত বৈভব-মহিমা তিরোহিত হইয়া, রাণী ঠাকুরাণীর দৈন্যদশা ক্রমশঃই বৃদ্ধি হইতে লাগিল। এই সময়ে আর একটা ঘটনা হওয়ায় তাঁহার মর্মান্তিক কষ্ট উপস্থিত হইল। দত্তকপুত্র দামোদর-রাওর প্রতি রাণী ঠাকুরাণীর প্রগাঢ় প্রীতি ছিল। দামোদর- রাও সপ্তম বর্ষে পদার্পণ করিলেন, তাহার উপনয়নের প্রস্তাব হইল। কিন্তু এই সময়ে তাহার নিকট যথেষ্ট অর্থ না থাকায়, দামোদর-রাওর নামে যে টাকা জমা ছিল তাহা হইতে এক লক্ষ টাকা অনুষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহাৰ্থ কমিসনরের নিকট প্রার্থনা করিলেন। কমিসনর সাহেব তাহার বরিষ্ঠ পদবীর কর্তৃপক্ষকে এই বিষয়ে জানাইলেন। সেইখান হইতে এই উত্তর আসিল, চারি জন সুপ্রতিষ্ট লোকের জামানতিতে যদি এইরূপ লিখিয়া দেওয়া হয় যে, বালক বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়া যখন এই টাকা দাবী করিবে। তখনই এই টাকা সরকারী তহবিলে পূরণ করিয়া দেওয়া হইবে, তাহা হইলে এই টাকা দেওয়া যাইতে পারে। এই কথা-অনুসারে রাণী ঠাকুরাণী ৪ জন সুপ্রতিষ্ট ব্যক্তিকে জামিন দিয়া একলক্ষ টাকা লইয়া দামোদর-রাওর উপনয়ন অনুষ্ঠান সমাধা করিলেন।

 এইরূপে কায়ক্লেশে ও মনঃকষ্টে রাণীর জীবন অতিবাহিত হইতেছিল এমন সময়ে জগৎপ্রসিদ্ধ ১৮ ৫৭ অব্দের ভীষণ রক্তপতাকা ভারত-গগনে উডডান হইল। এই সম্বন্ধে স্বয়ং দামোদর-রাওর লেখনী হইতে যে খেদোক্তি নির্গত হইয়াছে তাহা এই ঃ-“এইরূপে, রাণী লক্ষ্মী বাই-সাহেব সৰ্ব্বসঙ্গ পরিত্যাগ করিয়া, রাজ্যের আশায় জলাঞ্জলি দিয়া, স্বীয় গ্রহ- বৈগুণ্যর দিন ঈশ্বর-চিন্তায় অতিবাহিত করিতেছিলেন, কিন্তু সেই পূর্ব গ্ৰহবৈগুণ্যের লাঘব না হইতে হইতেই অভিনব দুর্ভাগ্য দারুণভাবে তাহার পৃষ্ঠানুসরণ করিল। ধ্যানে, মনে বা স্বপ্নেও যাহা অকল্পনীয়, ঘরে বসিয়া এইরূপ সঙ্কটে তিনি পতিত হইলেন এবং নিজেরও সেই সঙ্গে আমাদিগের সুখ সৰ্বস্ব নষ্ট করিয়া ও পরিশেষে স্বীয় জীবন পর্যন্ত আহুতি দিয়া, এই অজ্ঞান-দেশে এই জগতীতলে আমাদের জন্য কোন আশ্রয়স্থান রাখিয়া গেলেন না।”

 মহারাণী লক্ষ্মীবাই ঔদাস্যব্রত ত্যাগ করিয়া, কিরূপে অল্পে অল্পে বিপ্লব-তরঙ্গের মধ্যে–ঘোর সমরাবর্তের মধ্যে নীত হইয়াছিলেন, তাহার বিবরণ পরে দেওয়া যাইবে। আপাতত এই বলিয়া উপসংহার করি,

“ভবিতব্যং ভবত্যেব, কৰ্ম্মণামীদৃশী গতিঃ।”