পাতা:আত্মচরিত (প্রফুল্লচন্দ্র রায়).djvu/২০৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


আর অধিক দন্টান্ত উল্লেখ না করিয়া আমি শধ্যে এখানে শ্রীয়েত সতীশচন্দ্র দাশ গতের বণনা উদ্ধত করিব। তিনি নিজে বন্যা-বিধাসত অঞ্চল পরিদর্শন করেন, শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও প্রদব্রজে ভ্রমণ করিয়া স্বচক্ষে সমস্ত অবস্থা দেখেন। “একটি গ্রামে, একটি পরিবার ব্যতীত সমস্ত লোককে আমি কুমদ ফলের মল খাইয়া জীবন ধারণ করিতে দেখিয়াছি। সপ্তাহের পর সপ্তাহ তাহারা অন্ন কাহাকে বলে জানিতে পারে নাই। গ্রামে অনাহারেও লোকের মৃত্যু হইয়াছে। মেয়েরা ছিন্ন বস্ত্র পরিয়াছিল, পর ষেরা দবল ও নৈরাশ্যগ্রসত, বালক বালিকাদের বাস্থ্য শোচনীয়। আমি যখন গিয়াছিলাম, দেখিতে পাইলাম যে, কতকগুলি বালক বালিকা কুমদ ফলের মলের সন্ধান করিতেছে। এবং মেয়েরা গহে উহাই খাদ্যের জন্য সিদ্ধ করিতেছে। টাঙ্গাইলের বাসাইল থানার অন্তগত চাকদা গ্রামের এই অবসথা। বন্যা বিধাসত অঞ্চলে এমন শত শত গ্রাম আছে, যাহার অবস্থা এর চেয়ে ভাল নয়। যেখানে কুমদ ফল হয় না, অথবা যথেষ্ট পরিমাণে পাওয়া যায় না, সেখানে লোকে কলা পাতার অশি খাইয়া জীবন ধারণ করিতেছে।” শ্ৰীষত ক্ষিতীশচন্দ্র দাশগুপ্তও বন্যাপীড়িত অঞ্চলে লোকের অবস্থা পরিদর্শন করিতে গিয়াছিলেন। তিনি লোকের বাড়ীতে রন্ধনশালার ভিতরে গিয়া, তাহারা কি খাইয়া বাঁচিয়া আছে অনুসন্ধান করিয়া দেখিয়াছিলেন। “একটি বাড়ী প্রবেশ করিয়া ঘরের মধ্যে চাহিয়া ক্ষিতাঁশ বাব এককোণে দইখানি ইক্ষাখণ্ড দেখিলেন। গহস্বামী ক্ষিতীশ বাবকে তৎক্ষণাৎ বাবাইয়া দিলেন যে উহা ইক্ষখণ্ড নহে, কদলীর ডগা মাত্র। ঐগুলি চাঁচা হইয়াছে, সেজন্য ইক্ষর মত দেখাইতেছে। সোজা কথায় ওগুলি ‘নকল ইক্ষদণ্ড'। ছোট ছেলে মেয়েরা যখন কাঁদে এবং তাহাদের খাইতে দিবার কিছু থাকে না, তখন উহা ইক্ষ্যখণ্ডের মত ছোট ছোট করিয়া কাটিয়া তাহদের দেওয়া হয়। তাহারা সেগুলি চিবাইয়া রস পান করে। এই ভাবে পরিশ্রান্ত হইয়া পড়ে এবং আর কাঁদে না। শিশুরা চিবাইয়া যে ছোবড়া ফেলিয়া দিয়াছে, তাহাও ক্ষিতীশ বাবকে দেখানো হইল। ক্ষিতীশ বাব ঐগুলি লইয়া আসিয়াছিলেন। বিজ্ঞান কলেজে উহা দেখানো হইতেছে। - “তার পর ক্ষিতীশ বাব আর একটি বাড়ীতে প্রবেশ করিলেন। সেখানে রান্নাঘরে গিয়া তিনি দেখিলেন যে, দুইটি ছোট ছেলে এক কোণে বসিয়া গোপনে কি যেন খাইতেছে। ক্ষিতাঁশ বাব জিনিষটা কি জানিতে চাহিলেন এবং থালাখানা বাহিরে লইয়া আসিলেন। দেখিলেন, ছেলেরা কি একটা আটার মত জিনিষ খাইতেছিল। ছেলেদের বাপ বঝোইয়া দিল, উহা কচু সিদ্ধ মাত্র। উহার সঙ্গে লবণও ছিল না। বাপ যখন কথা বলিতেছিল, সেই সময় একটা ছয় বৎসরের মেয়ে আসিয়া থালা হইতে তাড়াতাড়ি খাইতে আরম্ভ করিল। ছোট ছেলেদের জন্য খানিকটা রাখিবার জন্য মেয়েটিকে বলা হইল, কিন্তু কথা শেষ হইবার পবেই সে বাকটকু এক গ্রাসে খাইয়া ফেলিল। ছোট ছেলে দুইটি হতাশ হইয়া কাঁদতে লাগিল। ওইটকুই ছিল শেষ সবল। বাপ বেচারা রান্না ঘর হইতে পার আনিয়া দেখিল, আর কিছই অবশিষ্ট নাই।” দৈনিক সংবাদ পত্র হইতে উদ্ধত ঐ সমস্ত বৃণনা হইতে বাবা যায়, দেশের শাসন প্রণালী কি ভাবে চলিতেছে। ঐ সমস্ত বর্ণনাই প্রকৃত অবস্থা জ্ঞাপন করিতেছে, উহার উপর কোনরাপ টীকা নিম্প্রয়োজন। কিন্তু তথাপি সাম্রাজ্যবাদের কবি তাঁহার ভারতীয় অভিজ্ঞতা লইয়া নিনোধত অর্থহীন বাজে কবিতা লিখিতে কুণ্ঠিত হন না। ঐগলি বোধ হয় স্বদেশবাসী এবং বিশ্ববাসীদের মনকে প্রতারিত করিবার জন্য।