পাতা:আত্মচরিত (প্রফুল্লচন্দ্র রায়).djvu/২৭১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


এত চাঞ্চল্য হইত না। লণ্ডন বন্দরের জাহাজ নিমাতারা আতঙ্কসচক চীৎকার সরে: করিয়া দিল; তাহারা প্রচার করিতে লাগিল যে, তাহাদের ব্যবসা ধবংস হইবার উপক্ৰম এবং লন্ডনের যত জাহাজ ব্যবসায়ীদের পরিবারবগ না খাইয়া মরিবে।" (Taylor: History of India) ; লর্ড ওয়েলেসলির অভিপ্রায় ছিল যে, ভারতীয় জাহাজ পণ্য বহন করিয়া ইংলন্ডের বন্দরে প্রবেশ করিতে পারবে এবং এইরপে ব্রিটিশ জাহাজগুলির সঙ্গে সমানাধিকারে বাণিজ্য করিতে পরিবে। কিন্তু ভারতীয় জাহাজ শিল্পকে উৎসাহ দেওয়ার এই উদার ও সঙ্গত নীতি, ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের চীৎকারে রহিত হইল। বোড অব ডিরেক্টর এবং কোম্পানীর মালিকগণ বড়লাটের এই উদার নীতির তীব্র নিন্দা করিয়া কড়া প্রস্তাব গ্রহণ করিলেন। বতমান সময়েও আমরা দেখিতেছি, যখনই বাংলা কিবা বোম্বাইয়ে সবদেশী স্টীমার লাইন চালাইবার চেষ্টা হইয়াছে, তখনই একাধিপত্য-ভোগকারী শক্তিশালী ব্রিটিশ কোম্পানীগুলি প্রাণপণে এই সব স্বদেশী ব্যবসায়ীকে প্রারম্ভেই গলা টিপিয়া মারিতে চেস্টা করিয়াছে। কলিকাতার ইস্ট বেঙ্গল রিভার স্টীমার সাভিস লিমিটেডের প্রতিনিধিরপে, ভারতীয় পোত শিল্প কমিটির সম্মুখে শ্ৰীযন্ত যোগেন্দ্রনাথ রায় যে সাক্ষ্য প্রদান করেন, আমার কথার প্রমাণ স্বরপ তাহা হইতে কিয়দংশ উধত করিতেছি – "মলধনের অভাব অথবা দক্ষ পরিচালনার অভাবে এই কোম্পানীর উন্নতি ব্যাহত হয় না। ইয়োরোপীয় ব্যবসায়ীরা সকলে মিলিয়া একজোট হইয়া অবৈধভাবে এই ভারতীয় ব্যবসায়কে ধবংস করিতে চেষ্টা করিয়াছিল বলিয়াই ইহার অবস্থা শোচনীয় হইয়াছে। যখন এই কোম্পানী প্রথম কাজ সরে করে, তখন অধিকাংশ পাটের কল এই কোম্পানীর জাহাজে আনীত মাল লইত এবং মালের চালানী কাগজের অগ্রিম টাকাও দিত। কিন্তু কয়েক বৎসর পরে, ইয়োরোপীয় কোম্পানীগুলি দেখিল যে এই ভারতীয় কোম্পানী জাহাজের সংখ্যা বাড়াইতেছে ও ভাল ব্যবসা করিতেছে, এবং তাহার দষ্টাতে আরও নতন নতন ভারতীয় কোম্পানী গঠিত হইতেছে। তখন তাহারা পাটের কলের মালিকদের সঙ্গে এইরুপ চুক্তি করিল যে ভারতীয় কোম্পানীর জাহাজে আনীত মাল তাহারা গ্রহণ করিতে পারবে না।” সিন্ধিয়া টীম ন্যাভিগেশান কোম্পানীর অভিজ্ঞতা এর চেয়েও শোচনীয়। এই কোম্পানীর উপকল বাণিজ্যের জন্য অনেকগুলি জাহাজ আছে। এই কোম্পানীর চেয়ারম্যান শ্ৰীফত বালচাঁদ হীরাচাঁদ ১৯২৯ সালের ২৫শে নভেম্বর যে বস্তৃতা করেন, তাহাতে অনেক স্পষ্ট কথা আছেঃ “এই কোম্পানীর জাহাজগুলি যে পথে চলাচল করে, সেখানে বিদেশী কোম্পানীগলি প্রয়োজনের অতিরিক্ত বহ জাহাজ চালাইয়া থাকে। ইহার উপর উহারা এমন ভাবে মালের ভাড়া হ্রাস করিয়াছে যে কোন ভারতীয় কোম্পানীর পক্ষে প্রতিযোগিতায় আত্মরক্ষা করা কঠিন।" ব্রিটিশ রাজের অধীনস্থ ভারত গবৰ্ণমেণ্ট ইচ্ছাপবেকই ভারতীয় জাহাজ শিল্প ও ব্যবসায়ের প্রতি বিরুদ্ধভাব অবলম্বন করিয়াছেন। শ্ৰীষতে বালচাঁদ হীরাচাঁদ এই সম্পকে বলিয়াছেন—“ভারতের জাহাজ নিমাণের কারখানাগলিই কেবল একে একে লতে হয় নাই, পরন্তু ভারতে যাহাতে সরকারী প্রয়োজনেও জাহাজ নিমিত না হইতে পারে, তাহার জন্য গবৰ্ণমেণ্ট কার্যকরী ব্যবস্থা অবলম্বন করিয়াছেন। ইহার ফলে বোম্বাইয়ের প্রসিদ্ধ ডকইয়াড বহন বব ধরিয়া ইংলণ্ড ও ভারতের প্রয়োজনে প্রভূত কাষ করিয়া বন্ধ হইয়া গিয়াছে। এইরপে ভারতীয় পোতশিল্পের ধবংসযজ্ঞ সমাপ্ত হইল। যেদিন লন্ডনে ভারতে নিমিত জাহাজ ভারতীয় পণ্য বহন করিয়া উপস্থিত হইয়াছিল সেই দিন হইতেই ইংলন্ডের জাহাজ নিমাতাদের মনে