পাতা:গোরা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৫৯৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।


 অগ্নিগিরির অগ্নি-উচ্ছ্বাসের মতাে তখন গােরার মুখ দিয়া বাহির হইল, “মা, তুমি আমার মা নও?”

 আনন্দময়ীর বুক ফাটিয়া গেল; তিনি অশ্রুহীন বােদনের কণ্ঠে কহিলেন, “বাবা, গােরা, তুই যে আমার পুত্রহীনার পুত্র, তুই যে গর্ভের ছেলের চেয়ে অনেক বেশি বাবা।”

 গােরা তখন কৃষ্ণদয়ালের মুখের দিকে চাহিয়া কহিল, “আমাকে তবে তােমরা কোথায় পেলে?”

 কৃষ্ণদয়াল কহিলেন, “তখন মিউটিনি। আমরা এটোয়াতে। তােমার মা সিপাহিদের ভয়ে পালিয়ে এসে রাত্রে আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তােমার বাপ তার আগের দিনেই লড়াইয়ে মারা গিয়েছিলেন। তাঁর নাম ছিল—”

 গােরা গর্জন করিয়া বলিয়া উঠিল, “দরকার নেই তাঁর নাম। আমি নাম জানতে চাই নে।”

 কৃষ্ণদয়াল গােরার এই উত্তেজনায় বিস্মিত হইয়া থামিয়া গেলেন। তার পর বলিলেন, “তিনি আইরিশ্‌ ম্যান ছিলেন। সেই রাত্রেই তােমার মা তােমাকে প্রসব করে মারা গেলেন। তার পর থেকেই তুমি আমাদের ঘরে মানুষ হয়েছ।”

 এক মুহূর্তেই গােরার কাছে তাহার সমস্ত জীবন অত্যন্ত অদ্ভুত একটা স্বপ্নের মতাে হইয়া গেল। শৈশব হইতে এত বৎসর তাহার জীবনের যে ভিত্তি গড়িয়া উঠিয়াছিল তাহা একেবারেই বিলীন হইয়া গেল। সে যে কী, সে যে কোথায় আছে- তাহা যেন বুঝিতেই পারিল না। তাহার পশ্চাতে অতীতকাল বলিয়া যেন কোনাে পদার্থ ই নাই এবং তাহার সম্মুখে তাহার এতকালের এমন একাগ্রলক্ষবর্তী সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ একেবারে বিলুপ্ত হইয়া গেছে। সে যেন কেবল এক-মুহূর্ত মাত্রের পদ্মপত্রে শিশিরবিন্দুর মতাে ভাসিতেছে। তাহার মা নাই, বাপ নাই, দেশ নাই, জাতি নাই, নাম নাই, গােত্র নাই, দেবতা নাই। তাহার সমস্তই একটা কেবল ‘না’। সে কী

৫৮৪