পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/২২৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


দেবী চৌধুরাণী কিন্তু যার জন্য এত উদ্যোগ, তার মনে মুখ নাই । ব্ৰজেশ্বর আমোদ-আহলাদের জন্ত শ্বশুরালয়ে আসেন নাই । বাপের গ্রেপ্তারির জন্য পরোয়ান বাহির হইয়াছে—রক্ষার উপায় নাই । কেহ টাকা ধার দেয় না । শ্বশুরের টাক আছে —শ্বশুর ধার দিলে দিতে পারেন, তাই বজেশ্বর শ্বশুরের কাছে আসিয়াছেন । শ্বশুর বলিলেন, “বাপু হে, আমার যে টাকা,-সে তোমারই জন্য আছে—আমার আর কে আছে বল ? কিন্তু টাকাগুলি ষত দিন আমার হাতে আছে—তত দিন আছে ;–তোমার বাপকে থাকৃবে ? মহাজনে খাইবে । অতএব কেন আপনার ধন আপনি নষ্ট করিতে চাও ?” ব্ৰজেশ্বর বলিল, “হউক—আমি ধনের প্রত্যাশী নই, আমার বাপকে বাচান আমার প্রথম কাজ ।” শ্বশুর রুক্ষভাবে বলিলেন, “তোমার বাপ বঁচিলে আমার মেয়ের কি ? আমার মেয়ের টাক থাকিলে দুঃখ ঘুচিবে—শ্বশুর বঁচিলে দুঃখ ঘুচিবে না।” কড়া কথায় ব্রজেশ্বরের বড় রাগ হইল। ব্রজেশ্বর বলিলেন, “তবে আপনার মেয়ে টাকা লইয়া থাকুক । বুঝিয়াছি, জামাইয়ে আপনার কোন প্রয়োজন নাই । আমি জন্মের মত বিদায় হইলাম।” তখন সাগরের পিতা দুই চক্ষু রক্তবর্ণ করিয়া ব্ৰজেশ্বরকে বিস্তর তিরস্কার করিলেন । ব্রজেশ্বর কড়া কড়া উত্তর দিল । কাজেই ব্রজেশ্বর তল্পতল্প বাধিতে লাগিল। শুনিয়া সাগরের মাথায় বজাঘাত ङ्झेल । সাগরের মা জামাইকে ডাকিয়া পাঠাইলেন । জামাইকে অনেক বুঝাইলেন । জামাইয়ের রাগ পড়িল না । তার পর সাগরের পাল । বন্ধু শ্বশুরবাড়ী আসিলে দিবসে স্বামীর সাক্ষাৎ পাওয়া সে কালে যতটা দুরূহ ছিল, পিত্রালয়ে ততটা নয়। সাগরের সঙ্গে নিভৃতে ব্ৰজেশ্বরের সাক্ষাৎ হইল । সাগর ব্রজেশ্বরের পায়ে পড়িল—বলিল, “আর এক দিন থাক —আমি ত কোন অপরাধ করি নাই ?” ব্ৰজেশ্বরের তখন বড় রাগ ছিল—রাগে পা টানিয়া লইলেন । রাগের সময় শারীরিক ক্রিয়া সকল বড় জোরে জোরে হয়, আর হাত-পায়ের গতিও ঠিক অভিমতরূপ হয় না । একটা করিতে, বিকৃতি জন্য আর একটা হইয়া পড়ে । সেই কারণে, আর কতকটা সাগরের ব্যস্ততার কারণে পা সরাইয়া লইতে প্রমাদ ঘটিল। পা একটু জোরে সাগরের গায়ে লাগিল । সাগর মনে করিল, স্বামী রাগ করিয়া আমাকে লাথি মারিলেন । সাগর স্বামীর প। ছাড়িয়া গিয়া কুপিত দিলে কি আর ' ৩১ ফণিনীর ন্যায় দাড়াইয়া উঠিল। বলিল, “কি ? আমায় লাথি মারিলে ?” বাস্তবিক ব্ৰজেশ্বরের লাথি মারিবার ইচ্ছা ছিল না—তাই বলিলেই মিটিয়া যাইত । কিন্তু একে রাগের সময়, আবার সাগর চোখমুখ ঘুরাইয়া দাড়াইল— ব্ৰজেশ্বরের রাগ বাড়িয়া গেল। বলিলেন, “যদি মারিয়াই থাকি ? তুমি না হয় বড়মামুষের মেয়ে, কিন্তু পা আমার—তোমার বড়মানুষ বাপও এ প। এক দিন পূজা করিয়াছিলেন ।” সাগর রাগে জ্ঞান হারাইল । বলিল, “ঝকৃমারি করিয়াছিলেন । আমি তাঁর প্রায়শ্চিত্ত করিব।” ত্র। পালটে লাথি মার্বে না কি ? স। আমি তত অধম নহি । কিন্তু আমি যদি ব্রাহ্মণের মেন্ধে হই, তবে তুমি আমার পা— সাগরের কথা ফুরাইতে ন ফুরাইতে পিছনের জানেল হইতে কে বলিল, “আমার প। কোলে লইয়া চাকরের মত টিপিয়া দিবে " সাগরের মুখে সেইরকম কি কথা আসিতেছিল। সাগর ন৷ ভাবিয়া চিস্তিয়া পিছন ফিরিয়া না দেখিয় রাগের মাথায় সেই কথাই বলিল, “আমার পা কোলে লইয়। চাকরের মত টিপিয়া দিবে ।” বজেশ্বরও রাগে সপ্তমে চড়িয়া কোন দিক্‌ না চাহিয়া বলিল, “আমারও সেই কথা । ষত দিন আমি তোমার পা টিপিয়া না দিই, তত দিন আমিও তোমার মুখ দেখিব না। যদি আমার এই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হয়, তবে আমি অব্রাহ্মণ ।” তখন রাগে রাগে তিনটা হইয়া ফুলিয়া ব্রজেশ্বর চলিয়া গেল। সাগর পা ছড়াইয়া কাদিতে বসিল । এমন সময়ে সাগর যে ঘরে বসিয়া কঁাদিতেছিল, সেই ঘরে এক জন পরিচারিকা, ব্রজেশ্বর গেলে পরে সাগরের কি অবস্থা হইয়াছে, ইহা দেখিবার অভিপ্রায়ে ভিতরে প্রবেশ করিল, ছুতানাত করিয়া দুই একটা কাজ করিতে লাগিল । তখন সাগরের মনে পড়িল যে, জানেল হইতে কে কথা কহিয়াছিল। সাগর তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, “তুই জানেল হইতে কথা কহিয়াছিলি ?” সে বলিল, “কৈ, না ?” সাগর বলিল, “তবে কে জানেলায় দেখ ত ?” তখন সাক্ষাৎ ভগবতীর মত রূপবতী ও তেজস্বিনী এক জন স্ত্রীলোক ঘরের ভিতর প্রবেশ করিল। সে বলিল, “জানেলায় আমি ছিলাম।” সাগর জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কে গা ?”