পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/২৩৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


88 কাদাইবার জন্য ব্রজেশ্বর নাই। আমার ব্রজেশ্বর বৈকুণ্ঠেশ্বর একই ।” দেবী চক্ষু মুছিয়া বলিল, “তুমি যমের বাড়ী যাও ” নিশি। আপত্তি ছিল না । কিন্তু আমার উপর যমের অধিকার নাই । তুমি সন্ন্যাস ত্যাগ করিয়া ঘরে ষাঁও । দেবী। সে পথ খোলা থাকিলে, আমি এ পথে আসিতাম না। এখন বজরা খুলিয়া দিতে বল। চার পাল উঠাও । তখন সেই জাহাজের মত বজরা চারিখানা পাল তুলিয়৷ পক্ষিণীর মত উড়িয়া গেল । mesmams নবম পরচেছদ ব্ৰজেশ্বর আপনার নৌকায় আসিয়া গম্ভীর হইয়া বসিল । সাগরের সঙ্গে কথা কহে না । দেখিল, দেবীর বজরা পাল তুলিয়া পক্ষিণীর মত উড়িয়া গেল । তখন ব্ৰজেশ্বর সাগরকে জিজ্ঞাসা করিল, “বজরা কোথায় গেল ?” সাগর বলিল, “তা দেবী ভিন্ন আর কেহ জানে না । সে সকল কথা দেবী আর কাহাকেও বলে না ।” ব্র । দেবী কে ? স। দেবী দেবী । ত্র । তোমার কে হয় ? সা। ভগিনী । ব্র । কি রকম ভগিনী ? সা : জ্ঞাতি । ব্ৰজেশ্বর আবার চুপ করিল। মাঝিদিগকে ডাকিয়া বলিল, “তোমরা বড় বজরার সঙ্গে যাইতে পার ?” মাঝিরা বলিল, “সাধ্য কি ? ও নক্ষত্রের মত ছুটিয়াছে।” ব্ৰজেশ্বর আবার চুপ করিল। সাগর ঘুমাইয়া পড়িল । প্রভাত হইল, ব্রজেশ্বরের বজরা খুলিয়া চলিল। সূর্য্যোদয় হইলে সাগর আসিয়া ব্রজেশ্বরের কাছে বসিল । ব্ৰজেশ্বর জিজ্ঞাসা করিল, “দেবী কি ডাকইতি করে ?” সা । তোমার কি বোধ হয় ? ত্র । ডাকাইতির সমান ত সব দেখিলাম—- ডাকাইতি করিলে করিতে পারে, তাও দেখিলাম । তৰু বিশ্বাস হয় না যে, ডাকাইতি করে । , সা। তবু কেন বিশ্বাস হয় না ? ব্র । কে জানে। ডাকাইতি না করিলেই বা এত ধন কোথায় পাইল ? বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী সী । কেহ বলে, দেবী দেবতার বরে এত ধন পাইয়াছে ; কেহ বলে, মাটীর ভিতর পোত টাক৷ পাইয়াছে ; কেহ বলে, দেবী সোণা করিতে জানে । ব্র । দেবী কি বলে ? সা। দেবী বলে, “এক কড়াও আমার নয়, সব পরের ” ব্র। পরের ধন এত পাইল কোথায় ? সা। তা কি জানি । ব্র । পরের ধন হ’লে অত আমিরী করে, পরে কিছু বলে না ? সা। দেবী কিছু আমিরী করে না। খুদ খায়, মাটীতে শোয়, গড় পরে। কা’ল যা দেখলে, সে সকল তোমার আমার জন্ত মাত্ৰ—কেবল দোকানদারি । তোমার হাতে ও কি ? সাগর ব্রজেশ্বরের আঙ্গুলে নুতন আঙ্গটি দেখিল । ব্ৰজেশ্বর বলিল, “কাল দেবীর নৌকায় জলযোগ করিয়াছিলাম বলিয়, দেবী আমাকে এই আঙ্গটি মর্য্যাদা দিয়াছে।” সী । দেখি । ব্রজেশ্বর আঙ্গটি খুলিয়া দেখিতে দিল । সাগর হাতে লইয়া ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া দেখিল । বলিল, “ইহাতে দেবী চৌধুরাণীর নাম লেখা আছে।" ব্র । কই ? স। 1 ভিতরে—ফারসীতে । ব্র । ( পড়িয়া ) এ কি এ ? এ যে আমার নাম —আমার আঙ্গটি ! সাগর ! তোমাকে আমার দিব্য, যদি তুমি আমার কাছে সত্য কথা না কও । আমায় বল, দেবী কে ? সা। তুমি চিনিতে পার নাক্ট, সে কি আমার দোষ ? আমি ত এক দণ্ডে টিনিয়াছিলাম । ত্র । কে ? কে ? দেবী কে ? সী । প্রফুল্ল । আর ব্রজেশ্বর কথা কহিল না । সাগর দেখিল, প্রথমে ব্রজেশ্বরের শরীরে কাটা দিয়া উঠিল, তার পর একটা অনিৰ্ব্বচনীয় আহলাদের চিহ্ন—উচ্ছলিত সুখের তরঙ্গ, শরীরে দেখা দিল । মুখ প্রভাময়, নয়ন উজ্জল অথচ জলপ্লাবিত, দেহ উন্নত, কাস্তি ফুৰ্ত্তিমন্ত্ৰী । তার পরেই আবার সাগর দেখিল, সব যেন নিরিয়া গেল। বড় ঘোরতর বিষাদ আসিয়া যেন সেই প্রভাময় কাস্তি অধিকার করিল । ব্ৰজেশ্বর বাক্যশূন্ত, স্পন্দন্ত, নিমেষশূন্ত। ক্রমে সাগরের মুখপানে চাহিয়া চাহিয়া ব্ৰজেশ্বর চক্ষু মুদিল । দেহ অবসন্ন হইল । ব্ৰজেশ্বর সাগরের কোলে মাথা রাখিয়া গুইয়া পড়িল ।