পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/৪১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


আনন্দমঠ లిన : - এই বলিয়া পরে আশীৰ্ব্বাদ করিয়া সত্যানন্দ শাস্তিকে বিদায় করিলেন । শাস্তি মনে মনে বলিল, “র বেটা বুড়ো! আমার কপালে আগুন ! আমি পোড়াকপালী, না তোর মা পোড়াকপালী ?” বস্তুতঃ সত্যানন্দের সে অভিপ্রায় নহে–চক্ষের বিদ্যুতের কথাই তিনি বলিয়াছিলেন, কিন্তু তা কি বুড়োবয়সে ছেলেমানুষকে বল। ষায় ? ms-szimmw mmus অষ্টম পরিচ্ছেদ সে রাত্রি শাস্তি মঠে থাকিবার অনুমতি পাইয়াছিলেন ; অতএব ঘর খুজিতে লাগিলেন । অনেক ঘর খালি পড়িয়া আছে। গোবৰ্দ্ধন নামে এক জন পরিচারক—সেও ক্ষুদ্রদরের সস্তান-প্রদীপ হাতে করিয়া ঘর দেখাইয়া বেড়াইতে লাগিল । কোনটাই শাস্তির পছন্দ হইল না । হতাশ হইয়া গোবৰ্দ্ধন ফিরিয়া সত্যানন্দের কাছে শাস্তিকে লইয়া চলিল । শাস্তি বলিল, “ভাই সন্তান, এই দিকে যে কয়টা ঘর রছিল, এ তো দেখা হইল না ?” গোবৰ্দ্ধন বলিল, “ও সব খুব ভাল ঘর বটে, কিন্তু ও সকলে লোক আছে ” শাস্তি । কারা আছে ? গোব । বড় বড় সেনাপতি আছে । শাস্তি । বড় বড় সেনাপতি কে ? গোব । ভবানন্দ, জীবাননা, ধীরাননা, জ্ঞানানন্দ । আনন্দমঠ আনন্দময় । শাস্তি । ঘরগুলো দেখি চল না ? গোবৰ্দ্ধন শাস্তিকে প্রথমে ধীরানন্দের ঘরে লইয়া গেল। ধারানন্দ মহাভারতের দ্ৰোণপৰ্ব্ব পড়িতেছিলেন । অভিমন্ত্য কি প্রকারে সপ্তরর্থীর সঙ্গে যুদ্ধ করিয়াছিল, তাহাতেই মন নিবিষ্ট—তিনি কথা কহিলেন না । শাস্তি সেখান হইতে বিনা বাক্যবয়ে চলিয়া গেল । শাস্তি পরে ভবাননের ঘরে প্রবেশ করিল। ভবানন্দ তখন উৰ্দ্ধদৃষ্টি হইয়া একখানা মুখ ভাবিতে ছিলেন । কাহার মুখ, তাহা জানি না, কিন্তু মুখখান বড় সুন্দর, কৃষ্ণ কুঞ্চিত সুগন্ধি অলকরাশি আকর্ণ প্রসারী ক্রযুগের উপর পড়িয়া আছে, মধ্যে অনিন্য ত্রিকোণ ললাটদেশ মৃত্যুর করাল কালচ্ছায়ায় গাহমান হইয়াছে। ষেন সেখানে মৃত্যু ও স্বত্যুঞ্জয় দ্বন্দ্ব করি তেছে। নয়ন মুজিত, ক্রযুগ স্থির, ওষ্ঠ নীল, গও পাণ্ডুর, নাসা শীতল, বক্ষ উন্নত, বায়ু বসন বিক্ষিপ্ত করিতেছে । তার পর যেমন করিয়া শরন্মেষ-বিলুপ্ত চন্দ্রমা ক্রমে ক্রমে মেঘদল উদ্ভাসিত করিয়া আপনার সৌন্দৰ্য্য বিকাশিত করে, যেমন করিয়া প্রভাতস্থৰ্য্য তরঙ্গাকৃতি মেঘমালাকে ক্রমে ক্রমে সুবর্ণীকৃত করিয়া ; আপনি প্রদীপ্ত হয়, দিজুগুল আলোকিত করে, স্থল, জল, কীটপতঙ্গ প্রফুল্ল করে, তেমনি সেই শবদেহে জীবনের শোভার সঞ্চার হইতেছিল । আহা, কি শোভা ! ভবানন্দ তাই ভাবিতেছিল, সেও কথা কহিল না । কল্যাণীর রূপে তাহার হৃদয় কাতর হইয়াছিল, শাস্তির রূপের উপর সে দৃষ্টিপাত করিল না । শাস্তি তখন গৃহাস্তরে গেল। জিজ্ঞাসা করিল, “এটা কার ঘর ?” গোবৰ্দ্ধন বলিল, “জীবানন্দ ঠাকুরের ” শাস্তি । সে আবার কে ? কৈ, কেউ ত এখানে নাই ? গোব । কোথায় গিয়াছেন, এখনি আসিবেন । শান্তি । এ ঘরটি সকলের ভাল । গোব । তা এ ঘরটা ত হবে না । শাস্তি । কেন ? গোব । জীবানন্দ ঠাকুর এখানে থাকেন। শাস্তি । তিনি না হয়, আর একটা ঘর খুঁজে নিন। গোব । তা কি হয় ? যিনি এ ঘরে আছেন, তিনি কৰ্ত্তা বল্লেই হয়, যা করেন, তাই হয় । শাস্তি । আচ্ছা, তুমি যাও, আমি স্থান না পাই গাছতলায় থাকিব । - এই বলিয়া গোবৰ্দ্ধনকে বিদায় দিয়া শাত্তি সেই ঘরের ভিতর প্রবেশ করিল । প্রবেশ করিয়া জীব-. নন্দের অধিকৃত কৃষ্ণাজিন বিস্তারণ পূর্বক প্রদীপটি উজ্জ্বল করিয়া লইয়া জীবানন্দের একখানি পুতি লইয়া পড়িতে আরম্ভ করিল। কিছুক্ষণ পর জীবানন্দ আসিয়া উপস্থিত হইলেন । শাস্তির পুরুষবেশ, তথাপি দেখিবামাত্র তাহাকে চিনিতে পারিলেন, বলিলেন, “এ কি এ ? শাস্তি ?” শাস্তি ধীরে ধীরে পুতিখানি রাখিয়া জীবানদের ; মুখের পানে চাহিয়া বলিল, “শাস্তি কে মহাশয় ?” জীবানন্দ অবাকৃ—শেষে বলিলেন, “শাস্তি কে মহাশয় ? কেন, তুমি শাস্তি নও ?” শাস্তি ঘৃণার সহিত বলিল, “আমি নবীনাননা গোস্বামী।” এই কথা বলিয়া সে আবার পুতি পড়িতে মন দিল ।