পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/৮৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

প্রতিবেদনকে নস্যাৎ করার জন্যে নানা আয়োজন চলেছে প্রতীচ্যের প্রতাপসংলগ্ন বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে। কখনো শুনছি উত্তর-মার্ক্সবাদের প্রস্তাবনা, কখনো দেখছি নব্য-ঐতিহাসিকতাবাদের ঝলকানি। একই সুতোয় গাঁথা বাখতিনের ভাববিশ্বে মার্ক্সীয় চেতনার গৌণ ভূমিকা প্রমাণের চেষ্টা। আবার একই নিঃশ্বাসে প্রতীচ্যের তাত্ত্বিক একথাও বলেছেন যে মার্ক্সবাদী প্রেক্ষণের কিছু কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্র বাখতিনকে আকর্ষণ করেছিল। ঐতিহাসিক বস্তুবাদের দর্শনে সমস্ত ক্রিয়ার সামাজিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তিভূমি যেভাবে স্বীকৃত হয়ে থাকে, বাখতিনের বিশ্ববীক্ষায় তার প্রাসঙ্গিকতা স্পষ্ট—এটাও তাঁরা অস্বীকার করতে পারেননি। ভাষাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক উচ্চারণের সামাজিক নির্দিষ্টতা মেডভেডেভ ও ভোলোশিনোভের নামে প্রচলিত রচনাগুলিতে মুখ্য আকল্প হিসেবে উপস্থিত। তাছাড়া এই দুটি নামে এবং স্বনামে লিখিত প্রতিবেদনে ব্যক্ত অনেকার্থদ্যোতনার ভাবনায় ঐতিহাসিক বাস্তবতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সামাজিক শ্রেণীর গুরুত্বের কথা বাখতিন বিশেষভাবে বলেছেন। এই ব্যাপারকে পাশ কাটাতে না-পেরে ঐ তাত্ত্বিকেরা বলেছেন, এতে মার্ক্সীয় চেতনার বিশেষত্ব নেই কেননা আরো অনেক সামাজিক তত্ত্ব ও দর্শন এরকম কথা বলে থাকে। রাবেলে ও তাঁর জগৎ বইতে বহুচর্চিত কার্নিভালের ধারণায় যদিও শ্রেণীবিভক্ত সমাজের অনুষঙ্গ দিবালোকের মতো স্পষ্ট, সামাজিক তাৎপর্যবহ উচ্চারণে একক বাচনের অনন্যতা ও বিশেষত্ব বেশি প্রকাশিত হয়েছে—এই হলো তাঁদের অভিমত। এতে তাঁরা অবসংগঠন ও অধিসংগঠনের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের অভিব্যক্তি দেখতে চাননি। একদিকে তাঁরা বলছেন, মার্ক্সীয় চেতনার অনুষঙ্গ বাখতিনের মধ্যে খোঁজা নিরর্থক, অন্যদিকে বলছেন, রুশ ইতিহাসের বিশিষ্ট বিকাশের পথ ধরে তিনি মার্ক্সবাদীদের পুঁজিবাদ-বিরোধী আবেগের অংশীদার হয়েছিলেন। তবে সবচেয়ে চমৎকার সিদ্ধান্ত সম্ভবত এই যে: ‘Bakhtin's explicit hostility to the isolating and alienating nature of capitalist social relations is cognate with one version of Marxism though it clearly does not imply any commitment to a belief in the socialist transformation of society.’ (তদেব: ১৫)। মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

 বাখতিন/মেডভেডেভ বা বাখতিন/ভোলোশিনোভ যেভাবে নিজেদের যুক্তি সাজিয়েছেন, তা অনুসরণ করে আমরা বিভিন্ন বর্গের উচ্চারণকে সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার বহুস্বরিক ফসল বলে বুঝতে পারি। সেই সঙ্গে আমাদের ধারণা হয়, কীভাবে দ্বিবাচনিকতার তাত্ত্বিক আকল্প ক্রমশ দৃঢ়মূল হয়েছে। দেখি, জটিল ও বিচিত্র প্রকরণের মধ্য দিয়ে বাচন, উচ্চারণ, প্রতিবেদন, জনসাধারণ, সামাজিক বর্গ অনবরত মিথষ্ক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছে এবং রূপ থেকে রূপান্তরে পরস্পরকে নিয়ে যাচ্ছে। এখানে মার্ক্সীয় চেতনার নির্যাস গভীর সংবেদনা নিয়ে উপস্থিত। যাঁরা নিতান্ত কুযুক্তির বশে তড়িঘড়ি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান যে বাখতিনের অবস্থান মূলত মার্ক্সবাদের অনেক বাইরে এবং তিনি পীড়নপ্রবণ সরকারি ভাবাদর্শের কাছে নিরুপায় আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়েছিলেন—তাঁরা জেনে-শুনে সত্যের অপলাপ করেন। তাঁরা বাখতিনের জীবন-সত্য এবং সত্য-সন্ধানকে জানতে চান না এবং নিজেরা আসলে শ্রেণী-বিভাজক বিশ্বপুঁজিবাদের তলপিবাহক হিসেবে প্রগতিবিরোধী সরকারি প্রতিভাবাদর্শের ধ্বজ বহন করেন। তাঁরা বাখতিনকে নিজেদের প্রয়োজনমাফিক পিঞ্জরে ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্যে ছেঁটে নিতে চান এবং পছন্দসই

৮১