পাতা:বিভূতি রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড).djvu/৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


م ألوم স্বাভাবিক করতে গেলে যেটুকু তফাৎ করতে হয় সেইটুকুই করেছেন লেখক—কিন্তু মূল আদলটায় বিশেষ পরিবর্তন হয়েছে কি ? সবচেয়ে বড় কথা, সাধারণ দরিদ্র বা নিম্নমধ্যবিত্ত, অশিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত, নিপীড়িত মানুষের প্রতি ভালবাসা, তাদের দারিদ্র্য-জর্জর জীবনযাত্রার প্রতি লোভ । হ্যা, আমি ইচ্ছে ক’রেই এই শব্দটা ব্যবহার করছি—এই জীবনের প্রতি একটা লোভই ছিল তার—নস্ট্যালজিয়া ছিল। দরিদ্র সংসারের কষ্টে সংগৃহীত আনাঙ্গে রান্না ভাটী-চচ্চড়ি, ডুমুর কি থোড়-ছেচকি, কি স্বল্প তেলে পোড়া-পোড়া-করে-ভাজা পাকা কাচকলা তার কাছে ধনীর গৃহের কালিয়া পোলাওর থেকে বেশী লোভনীয় ছিল । ৰাল্যে অভাবের মধ্যে মানুষ হয়েছিলেন বলেই তার মুখাদ্যের দিকে আকর্ষণ হয়ত একটু বেশী ছিল—পথের পাঁচালীর মৃধান্ত্রাণরুচি লুচির’ সৌরভ সম্বন্ধে উচ্ছ্বাস অপুর নয়, লেখকের নিজেরই অন্তরের কথা—ষ্ঠার স্বখাদ্য-লোলুপতা নিয়ে তার বন্ধু-বান্ধবরা তাকে যথেষ্ট পরিহাসও করতেন, কিন্তু তবু আমি জানি, তার কাছে এসব স্থখাদ্য প্রিয় হ’লেও প্রিয়তর ছিল দরিদ্রের অতিকষ্টে অতি-যত্নে রান্না করা আপাত-সামান্য খাদ্যসামগ্ৰী ! এর মধ্যে যে আন্তরিকতা সেইটেই তার কাছে বেশী মূল্যবান ছিল । নিম্নবিত্তদের প্রতি সহানুভূতি বা ভালবাসাই তার স্বষ্ট কাহিনী গল্প বা উপন্যাসের বড় কথা। শুধু তাই বা কেন, তার দিনলিপি—যার মধ্যে তিনি নিজের সত্তায় ধরা দিয়েছেন, তাতেও এই ভালোবাসাটাই প্রধান হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষদের প্রতি ভালবাস আর ঈশ্বর-বিশ্বাস । কিন্তু শেষোক্ত কথায় আরও পরে আসছি । ধনী-দুহিতা উচ্চশিক্ষিতা লীলার প্রতি প্রেম—অথবা বলা যায় অপুর প্রতি লীলার প্রেম— রোমান্সের রাজ্যে লেখকের দ্বিধা-জড়িত সসঙ্কোচ পদক্ষেপ । সেই জন্যেই তা পূর্ণ-মুকুলিত হতে পারে নি। অন্তরঙ্গতা ? তাও কি, রতুদি বা লীলাদি—কি অতসীর সঙ্গে যতটা স্বাভাবিক, সহজ, স্বতস্ফূর্ত—ততটা ? না । অপর্ণার সঙ্গে প্রণয় সম্পর্ক যত মধুর —এই অপর্ণ যদি ধনীকন্যা হ’ত তাহলে ততটা হ’ত কিনা সন্দেহ । জানি না এই অপর্ণার সঙ্গে তার প্রথমা স্ত্রী গৌরীর কোন সাদৃশ্য আছে কিনা, মানে চরিত্রগত—অথবা সবটাই কল্পনা, তবে পরবর্তী কালে শুনেছি সুন্দরী শিক্ষিতা পাত্রী—সুন্দরী শিক্ষিতা বলেই তার অপছন্দ হয়েছিল । এই ব্যাপার সর্বত্রই কিন্তু। যেমন জীবনের ক্ষেত্রে তেমনি তার সাহিত্যেও । দৃষ্টিপ্রদীপের আখড়ার মোহান্তকন্যা মালতী— যে পরে আখড়ার সর্বময়ী কী হ’ল—রুপে গুণে চরিত্রের দৃঢ়তায় শরৎচন্দ্রের নায়িকাদের মতো বুস্থানীয়, তার প্রতি জিতুর প্রেমের ব্যাপারটা বিশ্বাসযোগ্য ক’রে তুলতেও চেয়েছেন লেখক, কিন্তু জিতুকে সেখানে বাধা ষায় নি শেষ পর্যন্ত । ছোট-বৌঠাকরুনের মতো মেয়েও জিতুর সহানুভূতি পেয়েছে, কিন্তু প্রেম পায় নি-পেয়েছে অতি সাধারণ ঘরের মেয়ে হিরন্ময়ী । সহানুভূতিও ঢের বেশী পেয়েছে তার বৌদি-দীনদরিদ্র ঘরের মেয়ে। বই শেষ করতে গিয়ে বোধ হয় লেখকের মনে হয়েছে মালতীর প্রতি অবিচার করা হয়ে গেল--তাই সর্বশেষ পরিচ্ছেদে একটা উচ্ছ্বাস দিয়ে বই শেষ করেছেন, অবিচারের ওপর একটু রঙের তুলি বুলিয়েছেন ।