পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/১৮০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


কেদার রাজা SΑ4 কেদার মহানন্দে বেহালা ধরলেন, তাঁর বেহালা বাজানোর নাম আছে এ গ্রামে । অনেকক্ষণ ধরে গান-বাজনা চলল, আরও দু-তিনজন লোক এসে গান-বাজনায় যোগ দিলে—তবে গ্রামের । ভদ্রলোক কেউ আসে নি । কেদার বেহালায় কসরৎ দেখালেন প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে, তার পর আবার গান শরে হল । রাত আন্দাজ এগারটার সময় কি তারও বেশী যখন, গানের আভা তখন ভাঙল । একজন বললে, বাবাঠাকুর, আলো এনেছেন কি, না হয় চলন আলো ধরে দিয়ে আসি খাল পার করে— কেদারের হশ হল এতক্ষণ পরে, বাইরে এসে বললেন, তাই তো, চাঁদ অস্ত গেল কখন ? বড় অন্ধকার দেখছি যে— পঞ্চমীর চাঁদের অবিশ্যি যতক্ষণ থাকা সাধ্য ততক্ষণ সে বেচারী আকাশে ছিল, তার কোন কসর নেই । কেদার রাজার জন্যে দপর রাত পয্যন্ত অপেক্ষা করা তার সাধ্যাতীত । দাস কুমোর বললে—আমার সঙ্গে যদি কেউ আসে আমি বাবাঠাকুরকে খাল পার করে দিয়ে আসি– দু-তিনজন যেতে রাজী হল—একা রাত্রে কেউ ওদিকে যেতে রাজী হয় না, গড়ের মধ্যে আছে অনেক রকম গোলমাল । এ অঞ্চলে সবাই তা জানে। কেদার কিন্ত নিভীক লোক, তিনি কোন লোক সঙ্গে নিয়ে যেতে রাজী নন—দরকার নেই কিছল । তিনি এমনিই বেশ যাবেন । তব্যও জন চারেক লোক পাকাটির মশাল জালিয়ে তাঁকে গড়ের খাল পার করে দিয়ে এল। এত রাত হয়েছে কেদার সেটা পৰেব বুঝতে পারেন নি, তা হলে এত দেরি করতেন না, ছিঃ, কাজ বড় খারাপ হয়ে গিয়েছে ! কেদার বাড়ি ঢুকে দেখলেন মেয়ে খিল বন্ধ করে ঘরের মধ্যে শয়ে । মেয়েকে একা এত রাত পয্যন্ত এই বনে ঘেরা নিৎজ’ন বাড়িতে ফেলে বাইরে ছিলেন বলে মনে মনে লজিত ও অনন্তপ্ত হলেন, তবে কিনা এ অনুতাপ তাঁর নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারের মধ্যে দড়িয়ে গিয়েছে। আর মজা এই যে প্রতিরাত্রে ফিরবার সময়েই এই অনন্তাপ মনের মধ্যে হঠাৎ আবিভূত হয়, এর আসা আর যাওয়া দুই-ই অস্তুত ধরনের আকস্মিক, ন্যায়শাস্ত্রের 'বেগবেগা জাতীয় পদার্থ, আসবার সময় যত বেগে আসে, ঠিক তত বেগেই নিৰ্ম্মকান্ত হয়ে যায়—মনে এতটুকু চিহ্নও রেখে যায় না । শরৎ উঠে বাবাকে দোর খালে দিলে, ভাত বেড়ে খেতে দিলে । তার মনে রাগ অভিমান কিছুই নেই—সে জানে এতে কোনো ফলও নেই—বাবা যা করবেন তা ঠিকই করবেন । ও’র ঘাড়ে ভুত আছে, সে-ই ও'কে চরিয়ে নিয়ে বেড়ায়, উনি কি করবেন ? কিন্ত কেদারের ঘাড়ে সত্যিই ভুত চেপে আছে বটে । খাওয়াদাওয়ার পরে অত গভীর রাত্রেও বাবাকে বেহালার লাল খেরোর খোল খুলতে দেখে সে আর কথা না বলে থাকতে পারলে না । বাবা এখন আবার বেহালা বাজাতে বসলেই হয়েছে ! কেদার ব্যাপারটাকে সহজ করবার চেষ্টা করলেন । বেহালা যে তিনি ঠিক বাজাতে চাইছেন এখন তা নয়, তবে একটা সর মাথার মধ্যে বড় ঘরেছে—সেইটে একবারটি সামান্য একটু ভেজে নিতে চান । - শরৎ বললে, না বাবা, তোমার ঘমে না আসতে পারে, তোমার খিদে নেই, তেন্টা নেই, শরীরের ক্লাস্তি নেই, ঘুম নেই—সব জয় করে বসে না হয় আছ, কিস্ত আমি এই সারাদিন খাটছি, তুমি এখন রাতদপরে বেহালা নিয়ে কেকিরকোঁকর জড়ে দিলে কানের কাছে আমার চোখে ঘুম আসবে ? বি. র- ৩—১২