পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/২০৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


Šoყ বিভূতি-রচনাবলী —শোনো ও বাবা— সঙ্গে সঙ্গে সে খলস্তি হাতে রান্নাঘর থেকে বার হয়ে এসে নিচু চালের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে চেয়ে দেখলে, কেদার ভাঙা দেউড়ির পথে অদৃশ্য হয়েছেন। তার লজ্জা করতে লাগল, প্রায় অপরিচিত প্রভাস যে বসে সামনে—নইলে সে এতক্ষণ দেখিয়ে দিতো বাবা জোরে হেটে কতদর পালান। গড়ের খালে নামবার আগেই সে ছটে গিয়ে ধরে ফেলতো বাবার হাত । —ছিঃ, কি অন্যায় বাবার ! প্রভাসের দিকে চেয়ে বললে, একটু বসন, কেমন তো ? আমি মোহনভোগ চড়িয়ে এসেছি কড়ায়—আসছি নামিয়ে— প্রভাস খানিকক্ষণ একা বসে থাকবার পরে শরৎ কাসার কানা-উচু রেকাবিতে মোহনভোগ এনে ওর সামনে রাখলে, আর এক গেলাস জল । —কেমন হয়েছে বলনে তো প্রভাসদা ? শরতের সবর সম্পণে নিঃসঙ্কোচ—আত্মীয়তার সহজ হৃদ্যতায় মধুর ও কোমল । প্রভাস একটু অবাক হয়ে গেল ওর ‘দাদা’ ডাকে । শরতের মুখের দিকে চেয়ে বললে, আপনি কি করে জানলেন আমি আপনার চেয়ে বড় ? শরৎ মদ হাসিমুখে জবাব দিলে—আমি জানি । —কি করে জানলেন ? —বারে, ভুলে গেলেন ? ওবেলা তো জগন্নাথ জ্যেঠাকে বললেন এখানে বসে আপনার বয়সের কথা । - এইবার প্রভাসের মনে পড়ল । ওবেলা এ-কথা উঠেছিল বটে। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললে, বেশ হ’ল, আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল— শরৎ সে কথার কোন উত্তর না দিয়ে বললে, কেমন হয়েছে মোহনভোগ বললেন না যে ? —খবে ভাল হয়েছে। সত্যি বলছি চমৎকার হয়েছে— —মা খুব ভাল করতে পারতেন, তেমনটি আমার হাতে হয় না। —আমার একটা অনুরোধ রাখুন। আংটিটা পরনে আমার সামনে— শরৎ বাক্সটা খালে আংটিটা হাতে নিয়ে আঙুলে পরে বললে, বেশ হয়েছে । এই দেখন— প্রভাস আনন্দে গলে গিয়ে বললে, কি চমৎকার মানিয়েছে আপনার আঙলে । শরৎ ছেলেমানষের মত খুশিতে নিজের আঙুলের দিকে বার বার চেয়ে দেখতে লাগল । প্রভাস বললে, আচ্ছা, আপনি একা থাকেন, কাকা ধেরিয়ে গেলে ভয় করে না আপনার ? —ভয় করলেই বা করছি কি বলনে—উপায় তো নেই। বাবা লুকিয়ে পৰ্য্যস্ত পালিয়ে যান, পাছে আমি আটকে রাখি । ও’র ছেলেমানষি স্বভাব—দেখে আসছি এতটুকু বেলা থেকে। মা বেচে থাকতেও ঠিক আমনি করতেন— —আচ্ছা, আপনি কখনো কলকাতা দেখেছেন ? শরৎ ঠোঁট উলেট হেসে বললে, কলকাতা ! উঃ—তা আর জানি নে ! কখনো জীবনে গোয়াড়ি কেটনগর কি নবদ্বীপ দেখলাম না, তার কলকাতা । আমি এই গড়ের খালের জঙ্গলে কাটালাম সারা জীবনটা প্রভাসদা—সত্যি বলছি ভাল লাগে না । -- প্রভাস যেন বড় উৎফুল্ল হয়ে উঠল—পরক্ষণেই আবার সে ভাবটা চেপে সহজ তাচ্ছিল্যের সরে বললে, এ আর কি কঠিন আপনার কলকাতা দেখা ! যেদিন মন করবেন, সেদিনই হতে পারে । শরৎ হয"দীপ্ত বরে বললে, আপনি নিয়ে যাবেন প্রভাসদা ?