পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/২৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ર8 বিভূতি-রচনাবলী অপর সারা শরীরে একটা আনন্দের শিহরণ বহিল। অপণা যেন তাহার মনের গোপন কথাটি জানিয়া বুঝিয়াই কোথা হইতে একটা ছোট চাঁপা গাছের ডাল আনিয়া মাটিতে পতিয়াছে, দেখাইয়া বলিল—দ্যাখো কেমন—হবে না এখানে ? —হবে না আর কেন ? আচ্ছা, এত ফল থাকতে চাঁপা ফলের ডাল যে পততে গেলে ? অপণা সলৎজমাথে বলিল—জানি নে—যাও । অপ তো লেখে নাই, পত্রে তো একথা অপণাকে জানায় নাই যে, মিত্তির বাড়ির কপাউন্ডের চাঁপাফল গাছটা তাহাকে কি কটই না দিয়াছে এই দ’মাস । চাঁপা ফল যে হঠাৎ তাহার এত প্রিয় হইয়া উঠিয়াছে, একথাটি মনে মনে অনুমান করিবার জন্য এই কমব্যস্ত, সদা-হাসিমখে মেয়েটির উপর তাহার মন কৃতজ্ঞতায় ভরিয়া উঠিল । অপণা বলিল—এখানে একটু বেড়া দিয়ে ঘিরে দেবে ? মাগো কি ছাগলের উৎপাতই তোমাদের দেশে ! চারাগাছ থাকতে দেয় না, রোজ খেয়েদেয়ে সারা দােপর কঞ্চি হাতে দাওয়ায় বসে ছাগল তাড়াই আর বই পড়ি—দ পারে রোজ নিরদি আসেন, ও-বাড়ির মেয়েরা আসে, ভারী ভাল মেয়ে কিন্তু নির দিদি । আজ সারাদিন ছিল বর্ষা। সন্ধ্যার পর একটানা ব্যষ্টি নামিয়াছে, হয়ত বা সারা রাত্রি ধরিয়া বর্ষা চলিবে । বাহিরে কৃষ্ণাটমীর অন্ধকার মেঘে ঘনীভূত করিয়া তুলিয়াছে। বধ বলিল—রান্নাঘরে এসে বসবে ? গরম গরম সোঁকে দি—। অপর বলিল—তা হবে না, আজ এসো আমরা দুজনে এক পাতে খাবো ! অপণা প্রথমটা রাজী হইল না, অবশেষে স্বামীর পীড়াপীড়িতে বাধ্য হইয়া একটা থালায় রটি সাজাইয়া খাবার ঠাই করিল। অপ দেখিয়া বলিল—ও হবে না, তুনি আমার পাশে বসো, ও-রকম বসলে চলবে না । , আরও একটু—আরও—পরে সে বাঁ-হাতে অপণার গলা জড়াইয়া ধরিয়া বলিল—এবার এসো দু’জনে খাই— বধ হাসিয়া বলিল—আচ্ছা তোমার বদখেয়ালও মাথায় আসে, মাগো মা ! দেখতে তো খবে ভালমানষেটি ! লাভের মধ্যে বধর একরপ খাওয়াই হইল না সেরাত্রে । অন্যমনস্ক অপর গল্প করিতে করিতে থালার রীটি উঠাইতে উঠাইতে প্রায় শেষ করিয়া ফেলিল—পাছে স্বামীর কম পড়িয়া যায় এই ভয়ে সে বেচারী খান-তিনের বেশী নিজের জন্য লইতে পারিল না। খাওয়া-দাওয়ার পর অপণা বলিল—কই, কি বই এনেছ বললে, দেখি ? দু’জনেই কৌতুকপ্রিয়, সমবয়সী, সহমন, বালকবালিকার মত আমোদ করিতে, গল্প করতে, সারারাত জাগিতে, অকারণে অর্থহীন বকিতে দুজনেরই সমান আগ্রহ, সমান উৎসাহ । অপ একখানা নতুন-আনা রই খলিয়া বলিল—পড়ো তো এই পদটা ? অপণা প্রদীপের সলতেটা চাঁপার কলির মত আঙুল দিয়া উস্কাইয়া দিয়া পিলসজটা আরও নিকটে টানিয়া আনিল । পরে সে লভজা করিতেছে দেখিয়া অপর উৎসাহ দিবার জন্য বলিল—পড়ো না, কই দেখি ? অপণা যে কবিতা এত সন্দের পড়িতে পারে অপর তাহা জানা ছিল না। সে ঈষৎ লজ্জাজড়িত স্বরে পাঁড়তেছিল— গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা কুলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা— অপ পড়ার প্রশংসা করিতেই অপণা বই মুড়িয়া বন্ধ করিল। স্বামীর দিকে উজ্জলমথে চাহিয়া কৌতুকের ভঙ্গিতে বলিল—থাকগে পড়া, একটা গান করো না !