পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/২৯৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


RS8 বিভূতি-রচনাবলী করে এল । তাও তার বকে ঢিপ টিপ করছিল, কোন দিক থেকে ওরা এসে পড়ে নাকি । "ভগবান কাল বড় বাঁচিয়ে দিয়েছেন । মানুষ এত খল হতে পারে, এমন নয়-কে হয় করতে পারে, হাসিমুখে নিজ'লা মিথ্যে বলতে পারে-গ্রাম্য মেয়ে শরতের তা জানা ছিল না। বিশেষ করে সে যে বাপের মেয়ে ! কেদারের মেয়ে তাঁরই মত সরল । গৌরী-মা বললেন, নকুলেশ্বর তলায় গিয়ে একটু প্রসাদী বেলপাতা নিয়ে এসো। তোমার যাত্রার দিন, ওদের যাত্রার দিন । মায়ের ফুল বেলপাতা আমি মন্দির থেকে এনে দেবো। যাবার সময় গৌরী-মার চোখে জল এল, বললেন--তিনদিনের মায়া, তাতেই তোমায় ছেড়ে দিতে মন কেমন করছে । আরার এসো, দেশে ফেরবার সময় এখান দিয়েই হয়ে যাবে সরলারা । শরৎ চোখের জলে ভেসে গৌরী-মার পায়ের ধলো নিলে, বলল—অনেকদিন মাকে হারিয়েছি, আবার সেই মায়ের কথা আমার আপনাকে দিয়ে মনে পড়লো ৷ আশীবাদ করন মা । হাওড়া স্টেশন। মস্তবড় জায়গা । লোকজন গমগম করছে । লম্বা লম্বা রেলগাড়ি ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়াচ্ছে । আলোয় আলো চারিদিকে । ঘরের মধ্যে এসে রেলগাড়ি দাঁড়ায় কেমন করে ? সে সত্যিই চললো তবে ? কোথায় চললো ? বাবার সঙ্গে আর দেখা হবে না। কোথায় পড়ে রইল তার আবাল্য-পরিচিত গড়শিবপর ! যেখানকার গড়ের জঙ্গলে, তাদের কালো পায়রার দীঘির জলে, চৈত্র মাসে তুলোওড়া বড় শিমল গাছটার ছায়ায়, উত্তর দেউলের নিষ্ঠজন পথে বাদােড়নখাঁর শুকনো খোলের ঝুমঝুমির শব্দে তার যে জীবনের শরে, সেই মাটিতেই –সেখানকার জ্যোৎস্নার মধ্যে, বষ*ার দিনের মেঘের ছায়ায় যে জীবন সুখেদঃখে আপন পথ ধরে চলে এসেছিল এতদিন—সে জীবনের সঙ্গে আজ চিরদিনের মত ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল । শরৎ জানলা থেকে মুখ বাড়িয়ে দিল । চোখের জলে দ্রুত পলায়নপর টেলিগ্রাফের তারের খুটি, গাছপালা, ঘরবাড়ি সব ঝাপসা । কামরার মধ্যে শরৎ চেয়ে দেখলে অবাক হয়ে । কাদের সঙ্গে সে আজ দেশ ছেড়ে যাচ্ছে ? কারা এরা ? ওই মোটামত ফস রঙের গিনী, এই চৌদ্দ বছরের মেয়ে, ওই তিন চারটি ছোট বড় খাকি, কত্তা আছেন পর্ষগাড়িতে — এদের তো সে চেনে না । (I বাবা গান গাইতেন—‘দিয়ে মায়াবেড়ি পদে ফেলেচ বিপদে।" কত যে তার সাধ ছিল দেশবিদেশে বেড়াতে । গড়শিবপুরের জঙ্গল ভাল লাগে না । রাজলক্ষীর সঙ্গে সে কত গল্প । আজ তো সে-সব সফল হতেই চললো—কিস্ত এ ভাবে সব বছেড়ে, বাবাকে ছেড়ে গড়শিবপুর জন্মের মত ছেড়ে যেতে হবে, জন্মজন্মান্তরের গভীর চেতনা দিয়ে যে গড়শিবপরে তার মন অকিড়ে ধরে ছিল, তা সে কি কোনদিন ভাবতো ? আর সে ফিরবে না। বাবাকে সে কলঙ্কের হাত থেকে-লোকের টিটকিরি থেকে মন্ত রাখবে। তার ভাগ্যে পরের বাড়ির দাসী হয়ে চিরকাল বিদেশে নিবাসন—যা ঘটে ঘটুক — বড়ো বয়সে বাবার মখ হাসাতে পারবে না। বাবা হয়তো দেশে গিয়ে বলেছেন, মেয়ে মরে গিয়েছে। খুব ভাল। আর সে দেখা দেবে না । দেশের কাছে মত হয়েই থাকবে যতদিন বাঁচবে সে । রাতের অন্ধকারে বাংলা মুছে গেল । কামরাটা ছোট-ধামা, লণ্ঠন, পেটরা, বিছানা, জলের কাজোতে একটা দিক ঠাসা, অন্য দিকে শরৎ গহিণীর জন্য বিছানা পেতে দিলে