পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৩৩৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


মৌরীফুল ৩০৭ এই গ্রামে রাঘব চক্রবর্তী পুজারী বামুন ছিলেন। রাঘব চক্রবর্তীর কেহ ছিল না। পৈতৃক আমলের খড়ের বাড়িতে এক বাস করিতেন ; একাই নদীর ঘাট হইতে জল আনিয়া, বনের কাঠ কুড়াইয়া রাধিয়া-বাড়িয়া খাইতেন। গায়ে শক্তিও ছিল খুব, পিতামহের আমলের সেকেলে ভারী পিতলের ঘড়ী ভরিয়া দুটি বেলা এক পেয়া পথ দূরবর্তী গঙ্গা হইতে জল আনিতেন। ক্লান্তি বা আলস্ত কাহাকে বলে জানিতেন না । রাঘব চক্রবর্তী পয়সা চিনিতেন অত্যন্ত বেশী। বংশের চটার পাথা তৈয়ারী করিয়া কুড়ি দরে ডোমেদের কাছে ঘোষ-পাড়ার দোলে বিক্রয় করিতে পাঠাইয়া দিতেন। অবসর সময়ে ঝুড়ি, কুলো ডালা বুনিয়া বিক্রয় করিতেন। মাটির প্রতিমা গড়িতে পারিতেন। উলুখড়ের পি, ফুল-বাট তৈয়ারী করতেন। সুন্দর কাপড় রিপু করিতে পারিতেন । এ-সব তাহার উপরি আয়ের পন্থা ছিল। সংসারের কেহই নাই, না স্ত্রী, না ছেলেমেয়ে—কে তাহার পয়সা খাইবে, তবুও রাঘব টাকা জমাইয়া যাইতেন। একটা মাটির ভীড়ে পয়সাকড়ি রাখিতেন, সপ্তাহে একবার বা দুইবার ভাড়টি উপুড় করিয়া ঢালিয়া সব পয়সাগুলি সযত্নে গুনিতেন । ভীড়ের মধ্যে যাহ রাথিতেন পারতপক্ষে তাহা আর বাহির করিতেন না। গ্রামের সবাই বলিত, রাঘব চক্রবর্তী হাতে বেশ দু’পয়সা গুছাইয়া লইয়াছেন। একদিন দুপুরে পাক সারিয়া রাঘব আহারে বসিবার উদ্যোগ করিতেছেন, এমন সময়ে একখানা ছই-ঘেরা গরুর গাড়ি আসিয়া তাহার উঠানে থামিল। গাড়ি হইতে একটি পচিশ ছাব্বিশ বছরের যুবক বাহির হইয়া আসিল । রাঘব চিনিলেন, তার দূর-সম্পৰ্কীয় ভাগিনেয় নন্দলাল। নন্দলাল আসিয়া মামার পায়ের ধূলা লইল । রাঘব বলিলেন—এস বাবা । ছই-এর মধ্যে কে ? .. নন্দলাল সলজ্জমুখে বলিল—আপনার বউমা। —ও ! তা কোথায় যাবে? ঘোষ-পাড়ার দোল দেখতে বুঝি ? নন্দলাল অপ্রতিভের সুরে বলিল—তাঞ্জে না। আপনার আশ্রয়েই—আপাতত:—মানে, বামুনহাটির বাড়িঘর তো সব গিয়েছে। গত বছর মাঘমাসে বিয়ে—তা এতদিন বাপের বাড়িতেই ছিল—সেখান থেকে না আনিলে আর ভাল দেখাচ্ছে না । তাই নিয়ে আজ একেবারে এখানেই. রাঘব বিশেষ সন্তুষ্ট হইলেন না। তিনি চিরকালই একা থাকিয়া আসিয়াছেন, একা থাকিতেই ভালবাসেন। এ আবার কোথা হইতে উপসর্গ আসিয়া জুটিল, দ্যাথো কাণ্ড । যাহাহউক, আপাততঃ বিরক্তি চাপিয়া তিনি ভাগিনেয়-বধূকে নামাইয়া লইবার ও পুবদিকের ভিটার ছোট ঘরখানাতে তাহদের থাকিবার বন্দোবস্ত করিলেন। সন্ধ্যার পরে ভাগিনেয়কে জিজ্ঞাসা করিলেন—এখানে নিয়ে তো এলে, হাতে কিছু আছেটাছে তো ? আমার এখানে আবার বড় টানাটানি । ধান অঙ্কবার যা হয়, এবার তার সিকিও পাইনি। যজমানদের অবস্থাও এবার যা...