পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৫৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


৩২ বিভূতি-রচনাবলী জালিয়া চা ও খাবার করিয়া তাহাকে দিলেন, নিজেও খাইলেন। বলিলেন, আর একটু ভাল ক'রে গ্রামারটা পড়বে—আমি তোমাকে দাগ দিয়ে দেখিয়ে দেবো । অপুর লজ্জাটা অনেকক্ষণ কাটা গিয়াছিল,সে আলমারিটারদিকে আঙুল দিয়া দেখাইয়া বলিল—ওতে আপনার অনেক বই আছে ? সত্যেনবাবু আলমারি খুলিয়া দেখাইলেন। বেশীর ভাগই আইনের বই, শীঘ্রই আইন পরীক্ষা দিবেন। একখানা বই তাহার হাতে দিয়া বলিলেন—এখানা তুমি পড়েী-বাংলা বই, ইতিহাসের গল্প। অপুর আরও দু-একখানা বই নামাইয়া দেখিবার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারিল না। মাস দুই-তিনের মধ্যে বোর্ডিং-এর সকলের সঙ্গে তাহার খুব জানাশোনা হইয়া গেল। হয়ত তাহ ঘটিত না, কারণ তাহার মত লাজুক ও মুখচোরা প্রকৃতির ছেলের পক্ষে সকলের সহিত মিশিয়া আলাপ করিয়া লওয়াটা একরূপ সম্ভবের বাহিরের ব্যাপার, কিন্তু প্রায় সকলেই তাহার সহিত যাচিয়া আসিয়া আলাপ করিল। তাহাকে কে খুশী করিতে পারে— ইহা লইয়া দিনকতক যেন বোর্ডিং-এর ছেলেদের মধ্যে একটা পাল্লা দেওয়া চলিল। খাবারঘরে থাইতে বসিবার সময় সকলেরই ইচ্ছা—অপু তাহার কাছে বসে, এ তাড়াতাড়ি বড় পিড়িখানা পাতিয়া দিতেছে, ও ঘি খাইবার নিমন্ত্ৰণ করিতেছে। প্রথম প্রথম সে ইহাতে অস্বস্তি বোধ করিত, খাইতে বসিয়া তাহার ভাল করিয়া খাওয়া ঘটিত না, কোন রকমে খাওয়া সারিয়া উঠিয়া আসিত। কিন্তু যেদিন ফাস্ট ক্লাসের রমাপতি পর্যন্ত তাঁহাকে নিজের পাতের লেবু তুলিয়া দিয়া গেল, সেদিন সে মনে মনে খুশী তো হইলই, একটু গর্বও অনুভব করিল। রমাপতি বয়সে তাহার অপেক্ষা চার-পাঁচ বৎসরের বড়, ইংরেজি ভাল জানে বলিয়া হেডমাস্টারের প্রিয়পাত্র, মাস্টারেরা পর্যন্ত খাতির করিয়া চলেন, একটু গম্ভীরপ্রকৃতির ছেলেও বটে। খাওয়া শেষ করিয়া আসিতে আসিতে সে ভাবিল, আমি কি ওই গুমিলালের মত ? রমাপতিদা পর্যন্ত সেধে লেবু দিল । দেয় ওদের ? কথাই বলে না। দেবব্রত অন্ধকারের মধ্যে কাঠালতলাটায় তাহারই অপেক্ষা করিতেছিল। বলিল— আপনার ঘরে যাবো অপূর্বদা, একটা টাস্ক একটু বলে দেবেন ? পরে সে হাসিমুখে বলিল, আজ বুধবার, আর চারদিন পরেই বাড়ি যাবো। শনিবারটা ছেড়ে দিন, মধ্যে আর তিনটে দিন। আপনি বাড়ি যাবেন না, অপুর্বদা ? প্রথম কয়েকমাস কাটির গেল। স্কুল-কম্পাউণ্ডের সেই পাতাবাহার ও চীনা-জবার ঝোপটা অপুর বড় প্রিয় ইয়া উঠিয়াছিল। সে রবিবারের শান্ত দুপুরে রৌদ্রে পিঠ দিয়া শুকনা পাতার রাশির মধ্যে বসিয়া বসিয়া বই পড়ে। ক্লাসের বই পড়তে তাহার ভাল লাগে ন, সে-সব বই-এর গল্পগুলি সে মাসখানেকের মধ্যেই পড়িয়া শেষ করিয়াছে। কিন্তু মুশকিল এই যে, স্কুল লাইব্রেরীতে ইংরেজি বই বেশী ; যে বইগুলার বাধাই চিত্তাকর্ষক, ছবি বেশী,