পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ঊনবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৭৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


যাত্রী '99) ভঙ্কা বাজাতে যায় তবে হাটে বাজারে তার নাম হবে । কিন্তু, তার প্রভূর দরবার থেকে তার নাম খোওয়া যাবে। এই ভূমিকার মধ্যে আমার নিজের কৈফিয়ত আছে। কখনো অপরাধ করি নি তা নয়। সেই অপরাধের লোকসান ও পরিতাপ তীব্র বেদনায় অনুভব করেছি ব’লেই সাবধান হই । ঝড়ের সময় ধ্রুবতারাকে দেখা যায় না ব’লে দিকভ্রম হয়। এক এক সময়ে বাহিরের কল্লোলে উদভ্ৰান্ত হয়ে স্বধর্মের বাণী স্পষ্ট করে শোনা যায় না। তখন ‘কর্তব্য’ নামক দশমুখ-উচ্চারিত একটা শব্দের হুঙ্কারে মন অভিভূত হয়ে যায় ; ভুলে ষাই যে, কর্তব্য বলে একটা অবচ্ছিন্ন পদার্থ নেই, আমার ‘কর্তব্য’ই হচ্ছে আমার পক্ষে কর্তব্য । গাড়ির চলাটা হচ্ছে একটা সাধারণ কর্তব্য, কিন্তু ঘোরতর প্রয়োজনের সময়েও ঘোড়া যদি বলে “আমি সারথির কর্তব্য করব”, বা চাকা বলে “ঘোড়ার কর্তব্য করব", তবে সেই কর্তব্যই ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ডিমক্রেসির যুগে এই উড়ে-পড়া পড়ে-পাওয়া কর্তব্যের ভয়াবহতা চারি দিকে দেখতে পাই। মানবসংসার চলবে, তার চলাই চাই ; কিন্তু তার চলার রথের নানা অঙ্গ— কর্মীরাও একরকম করে তাকে চালাচ্ছে, গুণীরাও একরকম ক’রে তাকে চালাচ্ছে, উভয়ের স্বাকুবর্তিতাতেই পরস্পরের সহায়তা এবং সমগ্র রথের গতিবেগ , উভয়ের কর্ম একাকার হয়ে গেলেই মোট কর্মটাই পঙ্গু হয়ে যায়। এই উপলক্ষে একটি কথা আমার মনে পড়ছে। তখন লোকমান্য টিলক বেঁচে ছিলেন। তিনি তার কোনো এক দূতের ষোগে আমাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে বলে পাঠিয়েছিলেন, আমাকে যুরোপে যেতে হবে । সে সময়ে নন-কো-অপারেশন আরম্ভ হয় নি বটে কিন্তু পোলিটিকাল আন্দোলনের তুফান বইছে। আমি বললুম, “রাষ্ট্রক আন্দোলনের কাজে যোগ দিয়ে আমি যুরোপে যেতে পারব না।” তিনি বলে পাঠালেন, আমি রাষ্ট্রক চর্চায় থাকি, এ তার অভিপ্রায়বিরুদ্ধ। ভারতবর্ষের যে-বাণী আমি প্রচার করতে পারি সেই বাণী বহন করাই আমার পক্ষে সত্য কাজ, এবং সেই সত্য কাজের দ্বারাই আমি ভারতের সত্য সেবা করতে পারি। আমি জানতুম, জনসাধারণ টিলককে পোলিটিকাল নেতারূপেই বরণ করেছিল এবং সেই কাজেই তাকে টাকা দিয়েছিল। এইজন্য আমি তার পঞ্চাশহাজার টাকা গ্রহণ করতে পারি নি। তার পরে, বোম্বাই-শহরে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তিনি আমাকে পুনশ্চ বললেন, “রাষ্ট্রনীতিক ব্যাপার থেকে নিজেকে পৃথক রাখলে তবেই আপনি নিজের কাজ স্বতরাং দেশের কাজ করতে পারবেন ; এর চেয়ে বড়ো আর কিছু আপনার কাছে প্রত্যাশাই করি নি।” আমি বুঝতে পারলুম, টিলক যে গীতার ভাষ্য করেছিলেন সে কাজের অধিকার তার ছিল ; সেই অধিকার মহৎ অধিকার।