পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৫১৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চোখের বালি ৪৯৭ আশা বিহারীকে দেখিয়া যেন নির্ভর পাইল । কহিল, “তুমি যাওয়ার পর হইতে মা যেন আরো চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছেন । প্রথম দিন তোমাকে না দেখিয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘বিহারী কোথায় গেল।’ আমি বলিলাম, তিনি বিশেষ কাজে গেছেন, বৃহস্পতিবারের মধ্যে ফিরিবার কথা আছে।’ তাহার পর হইতে তিনি থাকিয়া থাকিয়া চমকিয়া উঠিতেছেন। মুখে কিছুই বলেন না, কিন্তু ভিতরে ভিতরে যেন কাহার অপেক্ষা করিতেছেন । কাল তোমার টেলিগ্রাম পাইয়া জানাইলাম, আজ তুমি আসিবে । শুনিয়া তিনি আজ তোমার জন্য বিশেষ করিয়া খাবার আয়োজন করিতে বলিয়াছেন । তুমি যাহা যাহা ভালোবাস, সমস্ত আনিতে দিয়াছেন, সম্মুখের বারান্দায় রাধিবার আয়োজন করাইয়াছেন, তিনি ঘরে হইতে দেখাইয়া দিবেন। ডাক্তারের নিষেধ কিছুতেই শুনিলেন না । অামাকে এই থানিকক্ষণ হইল ডাকিয়া বলিয়া দিলেন, ‘বউমা, তুমি নিজের হাতে সমস্ত রাধিবে, আমি আজ সামনে বসাইয়া বিহারীকে খাওয়াইব ।’ ” শুনিয়া বিহারীর চোখ ছলছল করিয়া আসিল । জিজ্ঞাসা করিল, “মা আছেন কেমন ।” আশা কহিল, “তুমি একবার নিজে দেখিবে এসো— আমার তো বোধ হয়, ব্যামো আরো বাড়িয়াছে।” o তখন বিহারী ঘরে প্রবেশ করিল। মহেন্দ্র বাহিরে দাড়াইয়া আশ্চর্য হইয়া গেল । আশা বাড়ির কতৃত্ব অনায়াসে গ্রহণ করিয়াছে— সে মহেন্দ্রকে কেমন সহজে ঘরে ঢুকিতে নিষেধ করিল । না করিল সংকোচ, না করিল অভিমান । মহেন্দ্রের বল আজ কতখানি কমিয়া গেছে । সে অপরাধী, সে বাহিরে চুপ করিয়া দাড়াইয়া রহিল – মার ঘরেও ঢুকিতে পারিল না । তাহার পরে ইহাও আশ্চর্য— বিহারীর সঙ্গে আশা কেমন অকুষ্ঠিতভাবে কথাবার্তা কহিল । সমস্ত পরামর্শ তাহারই সঙ্গে । সেই আজ সংসারের একমাত্র রক্ষক, সকলের স্বহৃৎ । তাহার গতিবিধি সর্বত্র, তাহার উপদেশেই সমস্ত চলিতেছে । মহেন্দ্র কিছুদিনের জন্য যে-জায়গাটি ছাড়িয়া চলিয়া গেছে, ফিরিয়া আসিয়া দেখিল, সে-জায়গা ঠিক আর তেমনটি নাই । বিহার ঘরে ঢুকিতেই রাজলক্ষ্মী তাহার করুণ চক্ষু তাহার মুখের দিকে রাখিয়া কহিলেন, “বিহারী, ফিরিয়াছিস ?” বিহারী কহিল, “হা, মা, ফিরিয়া আসিলাম * রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “তোর কাজ শেষ হইয়া গেছে ?” বলিয়া তাহার মুখের দিকে একাগ্ৰদূষ্টতে চাহিলেন। i