পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/১৯৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


૧૨ রবীন্দ্র-রচনাবলী বাগানটি নিয়ে সরলা থাকবে এই ছিল তার জীবনের সাধ। এমন-কি, তার বিশ্বাস ছিল এই বাগানই ওর সমস্ত মনপ্রাণ অধিকার করবে। ওর বিয়ে করবার গরজ থাকবে না । তার পরে তিনি চলে গেলেন, অনাথা হল সরল, পাওনাদারের হাতে বাগানটি গেল বিকিয়ে। সেদিন আমার বুক ভেঙে গিয়েছিল, দেখ নি কি তুমি। ও ষে ভালোবাসবার জিনিস, ভালোবাসব না ওকে ? মনে তো আছে একদিন সরলার মুখে হাসিখুশি ছিল উচ্ছসিত। মনে হত যেন পাখির ওড়া ছিল ওর পায়ের চলার মধ্যে। আজ ও চলেছে বুকভরা বোঝা বয়ে বয়ে, তবু ভেঙে পড়ে নি। একদিনের জন্যে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে নি আমারও কাছে, নিজেকে তার অবকাশও দিলে না ।” আদিত্যের কথা চাপা দিয়ে নীরজা বললে, “থামো গে থামো, অনেক শুনেছি ওর কথা তোমার কাছে, আর বলতে হবে না। অসামান্য মেয়ে । সেইজন্যে বলেছি ওকে সেই বারাসতের মেয়ে-স্কুলের হেড মিসট্রেস করে দাও। তারা তো কতবার ধরাধরি করেছে।” “বারাসতের মেয়ে ইস্কুল ? কেন আণ্ডামানও তো আছে।” “না, ঠাট্টা নয়। সরলাকে তোমার বাগানের আর যে-কোনো কাজ দিতে হয় দিয়ে৷ কিন্তু ওই অরকিড-ঘরের কাজ দিতে পারবে না।” “কেন হয়েছে কী ।” “আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি, সরলা অরকিড ভালো বোঝে না।” “আমিও তোমাকে বলছি, আমার চেয়ে সরল ভালো বোঝে। মেসোমশায়ের প্রধান শখ ছিল অরকিড়ে । তিনি নিজের লোক পাঠিয়ে সেলিবিস থেকে, জাভা থেকে, এমন-কি চীন থেকে অরকিড আনিয়েছেন, তার দরদ বোঝে এমন লোক তখন ছিল না।” কথাটা নীরজা জানে, সেইজন্যে কথাটা তার অসহ । “আচ্ছ। আচ্ছা, বেশ বেশ, ও নাহয় আমার চেয়ে ঢের ভালো বোঝে এমন-কি তোমার চেয়েও। তা হোক, তৰু বলছি ওই অরকিডের ঘর শুধু তোমার আমার, ওখানে সরলার কোনো অধিকার নেই। তোমার সমস্ত বাগানটা ওকেই দিয়ে দাও ন। যদি তোমার নিতান্ত ইচ্ছে হয় ; কেবল খুব অল্প একটু কিছু রেখে। যেটুকু কেবল আমাকেই উৎসর্গ-করা। এতকাল পরে অন্তত এইটুকু দাবি করতে পারি। কপালদোষে নাহয় আজ আছি বিছানায় পড়ে, তাই বলে”— কথা শেষ করতে পারলে না, বালিশে মুখ গুজে অশাস্ত হয়ে কাদতে লাগল। স্তম্ভিত হয়ে গেল আদিত্য। ঠিক যেন এতদিন স্বপ্নে চলছিল, ঠোকর খেয়ে