পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৬২০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গ্রন্থপরিচয় । ®ዓ আসছিল। হয়তে। এদের পরস্পরের মধ্যে একটা অপ্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে। এইজন্তই একে বলাক বল৷ হয়েছে। হংসশ্রেণীর মতনই তার মানসলোক থেকে যাত্রা করে একটি অনির্বচনীয় ব্যাকুলত নিয়ে কোথায় উড়ে যাচ্ছে । যুরোপীয় যুদ্ধের তড়িৎবার্তা এই কবিতা (২) লেখার অনেক পরে আসে। এও জ সাহেব বলেন যে, তোমার কাছে এই সংবাদ যেন তারহীন টেলিগ্রাফে এসেছিল। আমার এই অনুভূতি ঠিক যুদ্ধের অনুভূতি নয়। আমার মনে হয়েছিল যে, আমরা মানবের এক বৃহং যুগসন্ধিতে এসেছি, এক অতীত রাত্রি অবসানপ্রায় । মৃত্যু-দুঃখ-বেদনার মধ্য দিয়ে বৃহৎ নবযুগের রক্তাভ অরুণোদয় আসন্ন। সেজষ্ঠ মনের মধ্যে অরগরণ উদ্বেগ ছিল• • • এই কবিতা (s) যে-সময়কার লেখা তখনও যুদ্ধ শুরু হতে দু মাস বাকি আছে। তারপর শঙ্খ বেজে উঠেছে ; ঔদ্ধতো হোক, ভয়ে হোক, নিৰ্ভয়ে হোক্ল তাকে বাজানো হয়েছে। যে যুদ্ধ হয়ে গেল তা নুতন যুগে পৌছবার সিংহদ্বারস্বরূপ। এই লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে একটি সার্বজাতিক যজ্ঞে নিমন্ত্রণ রক্ষা করবার হুকুম এসেছে । তা শেষ হয়ে স্বর্গারোহণ পর্ব এখনও আরম্ভ হয় নি। আরও ভাঙবে, সংকীর্ণ বেড়া ভেঙে যাবে, ঘরছাড়ার দলকে এখনও পথে পথে ঘুরতে হবে। পাশ্চাত্তা দেশে দেখে এসেছি, সেই ঘরছাড়ার দল আজ বেরিয়ে পড়েছে । তার এক ভাবী কালকে মানসলোকে দেখতে পাচ্ছে যে-কাল সর্বজাতির লোকের । চাকভঙা মৌমাছির দল বেরিয়ে পড়েছে, আবার নূতন করে চাক বাধতে । শঙ্খের আহবান তাদের কানে পৌচেছে। রোমা রোল , বাট্রাও রাসেল প্রভৃতি এই দলের লোক । এর যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিল বলে অপমানিত হয়েছে, জেল খেটেছে, সার্বজাতিক কল্যাণের কথা বলতে গিয়ে তিরস্কৃত হয়েছে । এই দলের কত অখ্যাত লোক অজ্ঞাত পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে, বলছে, প্রভাত হতে আর বিলম্ব নেই। পাখির দল যেমন অরুণোদয়ের আভাস পায়, এর তেমনি নুতন যুগকে অন্তদৃষ্টিতে দেখেছে। বলাকা-রচনাকালে যে-ভাব আমাকে উৎকণ্ঠিত করেছিল এখনও সেই ভাব আমার মনে জেগে আছে । আমি আজ পর্যন্ত তাকে ফিরে ফিরে বলবার চেষ্টা করছি। বুকের মাঝে যে-আলোড়ন হল তার কী সার্বজাতিক অভিপ্রায় আছে তা আমি ধরতে চেষ্টা করেছি। পশ্চিম মহাদেশে ভ্রমণের সময়ে সে-চিন্তা আমার মনে বর্তমান ছিল। আমি মনে মনে একটা পক্ষ নিয়েছি ; একটা আহ্বানকে স্বীকার করেছি, সে-ডাককে কেউ মেনেছে কেউ মানে নি। বলকায় আমার সেই ভাবের সূত্রপাত হয়েছিল । আমি কিছুদিন থেকে অগোচরে এই ভাবের প্রেরণায় অস্পষ্ট আহবানের পথে অগ্রসর হয়েছিলাম । এই কবিতাগুলি আমার সেই যাত্রাপথের ধরজাস্বরূপ হয়েছিল। তখন ভাবের দিক দিয়ে যা অনুভব করেছিলুম, কবিতায় যা অস্পষ্ট ছিল, আজ তাকে সুস্পষ্ট আকারে বুঝতে পেরে আমি এক জায়গায় এসে দাড়িয়েছি । বলাক বইটার নামকরণের মধ্যে এই কবিতার (৩৬) মৰ্মগত ভাবট নিহিত আছে । সেদিন যে একদল বুনো হাসের পাখী সঞ্চালিত হয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারের স্তব্ধতাকে ভেঙে দিয়েছিল, কেবল এই ব্যাপারই আমার কাছে একমাত্র উপলব্ধির বিষয় ছিল না, কিন্তু বলাকার পাখা যে নিখিলের বাণীকে জাগিয়ে দিয়েছিল সেইটাই এর আসল বলবার কথা এবং বলাক বইটার কবিতাগুলির মধ্যে এই বাণীটিই নানা আকারে ব্যক্ত হয়েছে। 'বলাকা’ নামের মধ্যে এই ভাবটা আছে যে, বুনো হাসের দল নীড় বেঁধেছে, ডিম পেড়েছে, তাদের ছানা হয়েছে, সংসার পাতা হয়েছে— এমন সময়ে তারা কিসের আবেগে অভিভূত হয়ে পরিচিত বাসা ছেড়ে পথহীন সমুদ্রের উপর দিয়ে কোন সিন্ধুতীরে আরেক বাসার দিকে উড়ে চলেছে। সেদিন সন্ধ্যায় আকাশপথে যাত্রী হংস-বলাক আমার মনে এই ভাব জাগিয়ে দিল— এই নদী, বন, পৃথিবী, বসুন্ধর মানুষ সকলে এক জায়গায় চলেছে , তাদের কোথা থেকে শুরু কোথায় শেষ তা জানি নে। আকাশে ১২|৩৯