পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৮১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ ২৬১ আত্মসম্বরণ করিতে না পারিয়া প্রবঞ্চিত নির্বোধের সমস্ত চেষ্ট বঞ্চনাকারিণীর সম্মুখেই আগুনে ফেলিয়া দিল । সমস্ত ছাই হইয়া গেলে, ভূপতির আকস্মিক উদামত যখন শাস্ত হইয়া আসিল তখন চারু আপন অপরাধের বোঝা বহন করিয়া যেরূপ গভীর বিষাদে নীরব নতমুখে চলিয়া গেল তাহা ভূপতির মনে জাগিয়া উঠিল— সম্মুখে চাহিয়া দেখিল, ভূপতি বিশেষ করিয়া ভালোবাসে বলিয়াই চারু স্বহস্তে যত্ব করিয়া খাবার তৈরি করিতেছিল। ভূপতি বারান্দার রেলিঙের উপর ভর দিয়া দাড়াইল। মনে মনে ভাবিতে লাগিল— তাহার জন্য চারুর এই যে-সকল অশ্রাস্ত চেষ্টা, এই যে-সমস্ত প্রাণপণ বঞ্চনা ইহা অপেক্ষ সকরুণ ব্যাপার জগৎসংসারে আর কী আছে। এই-সমস্ত বঞ্চনা, এ তো ছলনাকারিণীর হেয় ছলনামাত্র নহে ; এই ছলনাগুলির জন্য ক্ষতহদয়ের ক্ষতযন্ত্রণ চতুগুণ বাড়াইয়া অভাগিনীকে প্রতি দিন প্রতি মুহূর্তে হৃৎপিণ্ড হইতে রক্ত নিষ্পেষণ করিয়া বাহির করিতে হইয়াছে। ভূপতি মনে মনে কহিল, ‘হায় অবলা, হায় দুঃখিনী । দরকার ছিল না, আমার এ-সব কিছুই দরকার ছিল না। এতকাল আমি তো ভালোবাসা না পাইয়াও “পাই নাই’ বলিয়া জানিতেও পারি নাই— আমার তো কেবল প্রফ দেগিয়া, কাগজ লিখিয়াই চলিয়া গিয়াছিল ; আমার জন্য এত করিবার কোনো দরকার ছিল না।’ তখন আপনার জীবনকে চারুর জীবন হইতে দূরে সরাইয়া লইয়া— ডাক্তার যেমন সাংঘাতিক ব্যাধিগ্রস্ত রোগীকে দেখে, ভূপতি তেমনি করিয়া নিঃসম্পর্ক লোকের মতো চারুকে দূর হইতে দেখিল ! ওই একটি ক্ষীণশক্তি নারীর হৃদয় কী প্রবল সংসারের স্বারা চারি দিকে আক্রান্ত হইয়াছে। এমন লোক নাই যাহার কাছে সকল কথা ব্যক্ত করিতে পারে, এমন কথা নহে যাহা ব্যক্ত করা যায়, এমন স্থান নাই যেখানে সমস্ত হৃদয় উদঘাটিত করিয়া দিয়া সে হাহাকার করিয়া উঠিতে পারে— অথচ এই অপ্রকাশ অপরিহার্য অপ্রতিবিধেয় প্রত্যহপুঞ্জীভূত দুঃখভার বহন করিয়া নিতান্ত সহজ লোকের মতো, তাহার স্থস্থচিত্ত প্রতিবেশিনীদের মতো, তাহাকে প্রতিদিনের গৃহকর্ম সম্পন্ন করিতে হইতেছে । ভূপতি তাহার শয়নগৃহে গিয়া দেখিল— জানালার গরাদে ধরিয়া অশ্রুহীন অনিমেষদৃষ্টিতে চারু বাহিরের দিকে চাহিয়া আছে। ভূপতি আস্তে আস্তে তাহার কাছে আসিয়া দাড়াইল— কিছু বলিল না, তাহার মাথার উপরে হাত রাখিল ।