সামান্য পরিমাণ জিনিস মজুত করা হইয়াছিল—তাহাতেও প্রচুর অপচয় ঘটিয়াছিল, এ তথ্য সকলের জানা আছে।
দুর্ভিক্ষ একদিনে আসে নাই। সরবরাহ-সচিবের উল্লিখিত বারো দফার কারণ হইতেই বঝিতে পারা যায়, কারাল মন্বন্তর ধীরে ধীরে বাঙলাকে গ্রাস করিয়াছে। ইহার প্রতিকার-চেষ্টায় কেন্দ্রীয় সরকার শোচনীয় ঔদাসীন্য দেখাইয়াছেন। দেশ-বিদেশের সৈন্য দলে দলে আসিয়া বাঙলাদেশ ভরিয়া ফেলিল, সহস্র সহস্র শত্রুকে বন্দী করিয়া আনা হইল—তাঁহাদের অনেকের বোঝা বাঙলার কাঁধে চাপিল, ব্রহ্ম হইতে অসংখ্য আশ্রয়ার্থী আসিয়া জুটিল, কলকারখানায় ভিন্ন প্রদেশ হইতে সংখ্যাতীত মজুর আসিল। কেন্দ্রীয় সরকার তখনও মনে করিতেছেন। বাঙলাদেশ অবাধে সকলের অন্ন যোগাইয়া যাইবে, কোন প্রকার অতিরিক্ত ব্যবস্থার প্রয়োজন নাই।
সৈন্যদের খাদ্য সাধারণ বরাদ্দ হইতে অনেক বেশি। শুধু চাউল নয়—ফলমূল তারি-তরকারি মাছ-ডিম-মাংস প্রভৃতিও তাহদের জন্য প্রচুর পরিমাণে ক্রীত হয়। ঐ সব জিনিস দুর্মূল্য ও দুষ্প্রাপ্য হওয়ায় চাউলের উপর টান বাড়িয়া গেল। ইহার উপর সরকার আবার সৈন্যদলের জন্য দশ লক্ষ টন খাদ্যশস্য সর্বদাই মজুত রাখিতে লাগিলেন। বড় বড় কারখানার মালকরা যুদ্ধের ব্যাপারে প্রচুর লাভবান হইয়া মজুর ও কর্মচারীদের জন্য ভবিষ্যতের খাদ্য-সঞ্চয় করিতে লাগিলেন। সরকার পরোক্ষে ইহাদের সহায়তা করিলেন। জনসাধারণের কথা কেহ ভাবিল না।
শত্রুর আক্রমণের আশঙ্কায় কয়েকটি জেলা হইতে ধান সরানো হইল। ধান সরাইলেই তো স্থানীয় লোকের পেটের ক্ষুধা ঐ সঙ্গে লোপ পায় না! খাদ্যবস্তুর সন্ধানে তাহারা ঘোরাঘুরি করিতে লাগিল। চাউলের দর হঠাৎ খুব বাড়িয়া গেল। ইহার উপর নৌকা ডুবাইয়া দিয়া নৌকার চলাচল নিয়ন্ত্রণ করিয়া জনসাধারণকে আরও ভীতিগ্রস্ত করা হইল। এরূপ ক্ষেত্রে লোকের মনে ভরসা জাগাইয়া রাখিবারই চেষ্টা করা উচিত। সরকার তাড়াহুড়া করিয়া এমন সব কাণ্ড করিতে লাগিলেন যে সাধারণে সরকারের উপর ক্রমশঃ আস্থা হারাইয়া ফেলিল। মন্বন্তর দেশব্যাপ্ত হইয়া পড়িল।