ছিয়াত্তুরে মন্বন্তরের ছবি বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠে প্রোজ্জ্বল হইয়া রহিয়াছে। এই বর্ণনায় সাহিত্যিক-সুলভ অতিশয়োক্তি কিছুমাত্র নাই। ১৭৭৮ খৃস্টাব্দে একটি দুর্ভিক্ষ-কমিশন বসে। কমিশন যে রিপোর্ট দিয়াছিলেন, আনন্দমঠের বর্ণনা তাহার কোন কোন অংশের হুবহু বাঙলা অনুবাদ। আনন্দমঠের চিত্রের সঙ্গে আজিকার দুরবস্থা মিলাইয়া দেখিলে বোঝা যাইবে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়াছে।
ছিয়াত্তুরে মন্বন্তরের পরেও দুর্ভিক্ষ অনেকবার হইয়াছে[১]। ইহার মধ্যে ১৮৭৩-৭৪ অব্দের দুর্ভিক্ষ দুই কোটি লোকের অন্নকষ্ট হইয়াছিল। কিন্তু দ্রুততার সহিত যথাযোগ্য ব্যবস্থা অবলম্বিত হয়; তাই সেবার লোকক্ষয় সামান্যই হইয়াছিল। দুর্ভিক্ষ-দমনে এই একবার মাত্র সরকার কৃতিত্ব দেখাইয়াছিলেন। কিন্তু ৭৩-৭৪ অব্দের ব্যবস্থা এবারে সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হইয়াছে। বরঞ্চ ১৭৭০, ১৭৮৩ ও ১৮৬৬ অব্দে যে অদূরদর্শিতা ও অব্যবস্থার ফলে অবস্থা ভয়াবহ হইয়াছিল, পঞ্চাশের মন্বন্তরে অবিকল তাহাই দেখা যাইতেছে। আজিকার মতো তখন অবশ্য বৈদেশিক আক্রমণের আতঙ্ক ছিল না, কিন্তু এই একটি বিষয় ছাড়া সকল পারিপার্শ্বিকতা আশ্চর্যরূপ মিলিয়া যায়।
১৭৭০ খৃস্টাব্দে দুর্ভিক্ষের সূচনা হইলে, কর্তৃপক্ষ অমনি সৈন্যমণ্ডলীর ছয়মাসের খোরাকি কিনিয়া গুদামজাত করিবার মতলব করিলেন।’ অক্টোবর মাস হইতে দেশে হাহাকার উঠিল; নভেম্বর মাসে ‘যাহার দুই এক কাহন হইয়াছিল, রাজপুরুষেরা তাহা সিপাহীর জন্য কিনিয়া রখিলেন।’ এই নভেম্বর মাসেই ‘কালেক্টর-জেনারেল আশঙ্কা করিলেন, দেশ। জনশূন্য হইয়া যাইবে।’
১৯৪৩ অব্দের অবস্থা অনুরূপ নয় কি? সরকারি ভাষাই উদ্ধৃত করিতেছি—‘দেশরক্ষীদের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনে সৈন্য-বিভাগের তরফ হইতে প্রচুর পরিমাণে খাদ্য-ক্রয় হইল। তাহা ছাড়া ‘জরুরী অবস্থার প্রতিষেধ হিসাবেও খাদ্য-ক্রয় করিতে হইয়াছে।’
তখনকার দিনে এই চাউল-মজতের ব্যাপারে এলাহাবাদ ও
- ↑ যথা:—১৭৮৩, ১৮৬৬, ১৮৭৩-৭৪, ১৮৭৫-৭৬, ১৮৮৪-৮৫, ১৮৯১-৯২, ১৮৯৭, ১৯০০ ইত্যাদি।
২৩