বৌ-ঠাকুরাণীর হাট/ত্রয়োবিংশ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

ত্রয়ােবিংশ পরিচ্ছেদ।

 বিভার প্রাণের মধ্যে আঁধার করিয়া আসিয়াছে। ভবিষ্যতে কি যেন একটা মর্ম্মভেদী দুঃখ, একটা মরুময়ী নিরাশা, জীবনের সমস্ত সুখের জলাঞ্জলি, তাহার জন্য অপেক্ষা করিয়া আছে, প্রতি মুহূর্ত্তে তাহার কাছে কাছে সরিয়া আসিতেছে। সেই যে জীবনশূন্যকারী চরাচরগ্রাসী শুষ্ক সীমাহীন ভবিষ্যৎ অদৃষ্টের আশঙ্কা, তাহারি একটা ছায়া আসিয়া যেন বিভার প্রাণের মধ্যে পড়িয়াছে। বিভার মনের ভিতরে কেমন করিতেছে! বিভা বিছানায় একেলা পড়িয়া আছে। এ সময়ে বিভার কাছে কেহ নাই। বিভা নিশ্বাস ফেলিয়া বিভা কাঁদিয়া বিভা আকুল হইয়া কহিল, “আমাকে কি তবে পরিত্যাগ করিলে? আমি তােমার কি অপরাধ করিয়াছি?” কাঁদিয়া কাঁদিয়া কহিতে লাগিল, “আমি কি অপরাধ করিয়াছি?” দুটি হাতে মুখ ঢাকিয়া বালিশ বুকে লইয়া কাঁদিয়া কাঁদিয়া বার বার করিয়া কহিল “আমি কি করিয়াছি?” “একখানি পত্র না, একটি লােকও আসিল না, কাহারো মুখে সংবাদ শুনিতে পাই না। আমি কি করিব? বুক ফাটিয়া ছট্ ফট্ করিয়া সমস্ত দিন ঘরে ঘরে ঘুরিয়া বেড়াইতেছি, কেহ তােমার সংবাদ বলে না, কাহারো মুখে তােমার নাম শুনিতে পাই না! মা গো মা দিন কি করিয়া কাটিবে!” এমন কত দিন গেল। এমন কত মধ্যাহ্নে কত অপরাহ্ণে কত রাত্রে সঙ্গীহীন বিভা রাজবাড়ির শূন্য ঘরে ঘরে একখানি শীর্ণ ছায়ার মত ঘুরিয়া বেড়ায়!

 এমন সময় একদিন প্রাতঃকালে রামমােহন আসিয়া “মা গাে জয় হােক্” বলিয়া প্রণাম করিল, বিভা এমনি চমকিয়া উঠিল, যেন তাহার মাথায় একটা সুখের বজ্র ভাঙিয়া পড়িল। তাহার চোখ দিয়া জল বাহির হইল। সে সচকিত হইয়া কহিল, “মােহন, তুই এলি!”

 “হাঁ মা, দেখিলাম, মা আমাদের ভুলিয়া গেছেন, তাঁহাকে একবার স্মরণ করাইয়া আসি!”

 বিভা কত কি জিজ্ঞাসা করিবে মনে করিল কিন্তু লজ্জায় পারিল না—বলে বলে করিয়া হইয়া উঠিল না—অথচ শুনিবার জন্য প্রাণটা ব্যাকুল হইয়া রহিল।

 রামমােহন বিভার মুখের দিকে চাহিয়া কহিল, “কেন মা, তােমার মুখখানি অমন মলিন কেন? তােমার চোখে কালি পড়িয়াছে। মুখে হাসি নাই। চুল রুক্ষ। এস মা, আমাদের ঘরে এস। এখানে বুঝি তােমাকে যত্ন করিবার কেহ নাই!”

 বিভা ম্লান হাসি হাসিল; কিছু কহিল না! হাসিতে হাসিতে হাসি আর রহিলনা। দুই চক্ষু দিয়া জল পড়িতে লাগিল—শীর্ণ বিবর্ণ দুটি কপােল প্লাবিত করিয়া জল পড়িতে লাগিল, অশ্রু আর থামে না! বহু। দিন অনাদরের পর একটু আদর পাইলে যে অভিমান উথলিয়া উঠে, বিভা সেই অতি কোমল, মৃদু, অনন্ত প্রীতিপূর্ণ অভিমানে কাঁদিয়া ফেলিল। মনে মনে কহিল, “এত দিন পরে কি আমাকে মনে পড়িল?”

 রামমােহন অর থাকিতে পারিল না, তাহার চোখে জল আসিল, কহিল—“একি অলক্ষণ! মা-লক্ষ্মী তুমি হাসি মুখে আমাদের ঘরে এস। আজ শুভ দিনে চোখের জল মােছ!”

 মহিষীর মনে মনে ভয় ছিল, পাছে জামাই তাঁর মেয়েকে গ্রহণ না করে। রামমোহন বিভাকে লইতে আসিয়াছে শুনিয়া তাঁহার অত্যন্ত আনন্দ হইল। তিনি রামমোহনকে ডাকাইয়া জামাই-বাড়ির কুশল জিজ্ঞাসা করিলেন, বিশেষ যত্নে রামমােহনকে আহার করাইলেন, রামমােহনের গল্প শুনিলেন, আনন্দে দিন কাটিল! কাল যাত্রার দিন ভাল; কাল প্রভাতেই বিভাকে পাঠাইবেন স্থির হইল। প্রতাপাদিত্য এ বিষয়ে আর কিছু আপত্তি করিলেন না।

 যাত্রার যখন সমস্তই স্থির হইয়া গেছে, তখন বিভা একবার উদয়াদিত্যের কাছে গেল! উদয়াদিত্য একাকী বসিয়া কি একটা ভাবিতেছিলেন।

 বিভাকে দেখিয়া সহসা ঈষৎ চমকিত হইয়া কহিলেন, “বিভা, তবে তুই চলিলি? তা’ ভালই হইল! তুই সুখে থাকিতে পারিবি। আশীর্ব্বাদ করি—লক্ষ্মীস্বরূপা হইয়া স্বামীর ঘর উজ্জ্বল করিয়া থাক্!”

 বিভা উদয়াদিত্যের পায়ের কাছে পড়িয়া কাঁদিতে লাগিল। উদয়াদিত্যের চোখ দিয়া জল পড়িতে লাগিল;—বিভার মাথায় হাত দিয়া তিনি কহিলেন,—“কেন কাঁদিতেছিস? এখানে তাের কি সুখ ছিল বিভা; চারিদিকে কেবল দুঃখ, কষ্ট, শােক। এ কারাগার হইতে পালাইলি—তুই বাঁচিলি!”

 বিভা যখন উঠিল, তখন উদয়াদিত্য কহিলেন, “যাইতেছিস্? তবে আয়। স্বামীগৃহে গিয়া আমাদের একেবারে যেন ভুলিয়া যাস্‌নে। এক এক বার মনে করিস্‌, মাঝে মাঝে যেন সংবাদ পাই।”

 বিভা রামমােহনের কাছে গিয়া কহিল, “এখন আমি যাইতে পারিব না!”

 রামমােহন বিস্মিত হইয়া কহিল, “সে কি কথা মা?”

 বিভা কহিল, “না, আমি যাইতে পারিব না। দাদাকে আমি এখন একলা ফেলিয়া যাইতে পারিব না। আমা হইতেই তাঁহার এত কষ্ট এত দুঃখ, আর আমি আজ তাঁহাকে এখানে ফেলিয়া রাখিয়া সুখ ভােগ করিতে যাইব? যত দিন তাঁহার মনে তিলমাত্র কষ্ট থাকিবে, তত দিন আমিও তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে থাকিব। এখানে আমার মত তাঁহাকে কে যত্ন করিবে?” বলিয়া বিভা কাঁদিয়া চলিয়া গেল।

 অন্তঃপুরে একটা গোলযােগ বাধিয়া উঠিল। মহিষী আসিয়া বিভাকে তিরস্কার করিতে লাগিলেন; তাহাকে অনেক ভয় দেখাইলেন, অনেক পরামর্শ দিলেন; বিভা কেবল কহিল—“না মা, আমি পারিব না!”

 মহিষী রােষে বিরক্তিতে কাঁদিয়া কহিলেন, “এমন মেয়েও ত কোথাও দেখি নাই!” তিনি মহারাজের কাছে গিয়া সমস্ত কহিলেন। মহারাজ প্রশান্ত ভাবে কহিলেন, “তা, বেশ ত, বিভার যদি ইচ্ছা না হয় ত কেন যাইবে?”

 মহিষী অবাক্ হইয়া, হাত উল্টাইয়া, হাল ছাড়িয়া দিয়া কহিলেন, —“তােমাদের যাহা ইচ্ছা তাহাই কর, আমি আর কোন কথায় থাকিব না।”

 উদয়াদিত্য সমস্ত শুনিয়া বিস্মিত হইলেন। তিনি বিভাকে আসিয়া অনেক করিয়া বুঝাইলেন; বিভা চুপ করিয়া কাঁদিতে লাগিল, ভাল বুঝিল না!

 হতাশ্বাস রামমােহন আসিয়া ম্লানমুখে কহিল, “মা, তবে চলিলাম। মহারাজকে গিয়া কি বলিব?”

 বিভা কিছু বলিতে পারিল না, অনেক ক্ষণ নিরুত্তর হইয়া রহিল!

 রামমােহন কহিল, “তবে বিদায় হই মা!” বলিয়া প্রণাম করিয়া উঠিয়া গেল। বিভা একেবারে আকুল হইয়া কাঁদিয়া উঠিল, কাতর স্বরে ডাকিল “মােহন!”

 মােহন ফিরিয়া আসিয়া কহিল, “কি মা?”

 বিভা কহিল, “মহারাজকে বলিও, আমাকে যেন মার্জ্জনা করেন। তিনি স্বয়ং ডাকিতেছেন, তবু আমি যাইতে পারিলাম না, সে কেবল নিতান্তই আমার দুরদৃষ্ট?”

 রামমােহন শুষ্কভাবে কহিল, “যে আজ্ঞা!”

 রামমােহন আবার প্রণাম করিয়া বিদায় হইয়া গেল। বিভা দেখিল, রামমােহান বিভার ভাব কিছুই বুঝিতে পারে নাই, তাহার ভারি গােলমাল ঠেকিয়াছে। একে ত বিভার প্রাণ যেখানে যাইতে চায়, বিভা সেখানে যাইতে পারিল না;—তাহার উপর রামমােহন, যাহাকে সে যথার্থ স্নেহ করে, সে আজ রাগ করিয়া চলিয়া গেল। বিভার প্রাণে যাহা হইল তাহা বিভাই জানে!

 বিভা রহিল। চোখের জল মুছিয়া প্রাণের মধ্যে পাষাণ-ভার বহিয়া সে তাহার দাদার কাছে পড়িয়া রহিল। ম্লান, শীর্ণ একখানি ছায়ার মত সে নীরবে সমস্ত ঘরের কাজ করে। উদয়াদিত্য স্নেহ করিয়া, আদর করিয়া কোন কথা কহিলে চোখ নীচু করিয়া একটুখানি হাসে। সন্ধ্যাবেলায় উদয়াদিত্যের পায়ের কাছে বসিয়া একটু কথা কহিতে চেষ্টা করে। যখন মহিষী তিরস্কার করিয়া কিছু বলেন, চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া শােনে, ও অবশেষে এক খণ্ড মলিন মেঘের মত ভাসিয়া চলিয়া যায়। যখন কেহ বিভার চিবুক ধরিয়া বলে, “বিভা তুই এত রােগা হতেছিস্ কেন?” বিভা কিছু বলে না, কেবল একটু হাসে।

 এই সময়ে ভাগবত পূর্ব্বোক্ত জাল দরখাস্তটি লইয়া প্রতাপাদিত্যকে দেখায়, প্রতাপাদিত্য আগুন হইয়া উঠিলেন—পরে অনেক বিবেচনা করিয়া উদয়াদিত্যকে কারারুদ্ধ করিবার আদেশ দিলেন। মন্ত্রী কহিলেন, “মহারাজ, যুবরাজ যে একাজ করিয়াছেন, ইহা কোন মতেই বিশ্বাস হয় না। যে শোনে সেই জিভ কাটিয়া বলে, ওকথা কানে আনিতে নাই। যুবরাজ একাজ করিবেন ইহা বিশ্বাসযােগ্য নহে।” প্রতাপাদিত্য কহিলেন, “আমারাে ত বড় একটা বিশ্বাস হয় না। কিন্তু তাই বলিয়া কারাগারে থাকিতে দোষ কি? সেখানে কোন প্রকার কষ্ট না দিলেই হইল। কেবল গােপনে কিছু না করিতে পারে তাহার জন্য পাহারা নিযুক্ত থাকিবে।”