সচিত্র রেল অবতার/চোরের গঙ্গাস্নান

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

চোরের গঙ্গাস্নান।

 তখন পূজোর ছুটি হয়েছে। বিদেশে যাঁরা কাজ করেন। তাঁরা বাড়ী আসছেন। ট্রেণে খুব ভিড়। স্পেশাল্ ট্রেণও। দিতে হচ্ছে। দারজিলিংএ দুটি বাবু কাজ করতেন, তাঁদি’কেও কল‍্কাতা আসতে হবে। তাঁরা দুজনে সহোদর ভাই। তাঁদের সঙ্গে আসবে—দুই ভাইয়ের পরিবার ও একটি ভাইপো। ভাইপোটি কলকাতায় বাপের নিকটেই থাকে ও পড়া শুনা করে, কিন্তু সম্প্রতি জ্বর ও পেটের অসুখ করায়, স্বাস্থ্য পরিবর্ত্তনের জন্য দারজিলিং এ এসেছিল। অসুখ তেমন সারে নাই, কিন্তু ছুটী যখন এসে পড়‍্ল, তখন কলকাতায় ফিরে আসতেই হচ্ছে। একে ত রেলে পরিবার, লগেজ পত্র নিয়ে চলা মুস্কিল, তা’তে আবার যদি রুগী সঙ্গে থাকে, তা’হলেই ত সোনায় সোহাগা!

 আরও বিপদ এই যে, দারজিলিং এ র ছোট গাড়ীতে মোটেই। পাইখানার বন্দোবস্ত নাই। টুলি গাড়ী চার দিক্ খোলা। অন্য। কোন রুগী হলে, তত ভাবনার কারণ নেই, কিন্তু এ যে উদরাময়ের রুগী—পাইখানা না হলে চলবে কেমন করে?

 কি বন্দোবস্ত করে, ভাইপোটিকে অন্ততঃ শিলিগুড়ি পর্য্যন্ত আনবেন, দুই ভায়ে অনেক যুক্তি পরামর্শ করে ঠিক হলো যে দুটো বেঞ্চি কাপড় চোপড় দিয়ে ঘিরে নিয়ে তাঁরা একটা কম্পার্টমেন্টের মতন করে ফেল‍্বেন। দু চারটে হাঁড়ি সঙ্গে থাকলেই পাইখানার কাজ চলে যাবে।

 শিলিগুড়ি থেকে সারাঘাট পর্য্যন্ত, একটা ইন্টারক্লাস কম্পার্টমেন্ট রিজার্ভ করবার জন্যও, শিলিগুড়ির ষ্টেশন মাষ্টারকে লেখা হলো।

 এই রকম বন্দোবস্ত করে তাঁরা পঞ্চমীর দিন দারজিলিং থেকে রওনা হ’লেন। ছোট ভাইপোটি পাহাড় দেখ‍্তে দেখ‍্তে আসছিল; আমনে থাকায় রোগটা তত জানাল না। তাঁরা বিনা গণ্ডগোলে শিলিগুড়ি এসে পৌঁছুলেন!

 শিলিগুড়িতে এসে যে কম্পার্টমেন্ট রিজার্ভ পাওয়া গেল, তা’তে আবার পাইখানা নাই! এখন সমস্ত রাত্রি না গেলেত গাড়ী সারাঘাট পৌঁছুবে না, তবে এ দীর্ঘকালের জন্য কি বন্দোবস্ত করা যায়? দুই ভাই মহা মুস্কিলে পড়‍্লেন। ছুটো ছুটি করে একবার টিকিট কালেক্টার, একবার স্টেশন-মাষ্টারের কাছে গেলেন, যদি একটা পাইখানা ওয়ালা গাড়ী পাওয়া যায়।

 ষ্টেশন-মাষ্টার ও টিকিট কালেক্টার অনেক চেষ্টা করলেন, কিন্তু সে রকম সুবিধামত কামরা দিতে পারলেন না। কাজেই দারজিলিংএর গাড়ীতে যেমন বন্দোবস্ত করা হয়েছিল, তেমনই বন্দোবস্ত করা হলো।

 * * * 

 হু হু শব্দে দারজিলিং মেল অন্ধকার ভেদ করে ছুটলো; শিকারপুর, জলপাইগুড়ি প্রভৃতি ষ্টেশন গুলো লাফে লাফে ছাড়িয়ে যেতে লাগলো। শিলিগুড়িতে সকলেই একটু জলযোগ করে নিয়েছিলেন। কম্পার্টমেন্টে তেমন জায়গা নাই, আধা বসা, আধা শোওয়া ভাবে সকলেই থাকলেন। বড় ভাই, ভাই পোটিকে দেখবার ভার নিয়ে, সবাইকে যেমন তেমন একটু ঘুমিয়ে নিতে বল্লেন।

 রাত্রেই রোগ বাড়ে—এ স্থলেও তাই হ’লো। বড় ভাইটি চার পাঁচবার উঠে ভাইপোর শৌচের ব্যবস্থা করে দিলেন।

 হাঁড়িটির মুখে সরা চাপা দেওয়া হয়েছিল বলে, দুর্গন্ধ কাকেও ভোগ কর‍্তে হল না।

 * * * 

 একটু ফরসা হয়েছে, এমন সময় গাড়ী সারাঘাটে পৌঁছুল! “কুলী চাই” “কুলি চাই” বলে কুলীর দল গাড়ীর কাছে দৌড়ে এল। বড় ভাই, ভাইপোটিকে কোলে নিয়ে, মেয়েদের সঙ্গে করে নিলেন। ছোট ভাই, জিনিষ পত্র কুলীর মাথায় দিয়ে ষ্টীমারে গেলেন।

 ষ্টীমারে কোনরকমে জুতজাত করে বস‍্বার পর, ষ্টীমার ছাড়‍্বার বিলম্ব আছে দেখে, ছোট ভাই, একটু ঠাণ্ডা হাওয়া পাওয়ার জন্য, তীরে নেমে পায়চারি কর‍্তে লাগলেন। হঠাৎ কেমন মনে হলো—একবার দেখি না কেন, সেই সরাচাপা হাঁড়িটা আছে কি নাই! পূজোর ভিড়ে চোরের উপদ্রব ত আছেই, এমন একটা আন‍্কোরা হাঁড়ি সরা চাপা দেওয়া থাক‍্লে, যে সন্দেশের হাঁড়ি নয়—কে মনে করবে? তাতে তাঁর বড় ভাই এমন ব্যবস্থা করেছিলেন, যে গাড়ীর ভিতর একটু জল পর্য্যন্তও পড়‍্তে পায় নাই। কুলী বেটাদের কেউ না কেউ নিশ্চয়ই এতক্ষণ হাঁড়িটে সরিয়েছে—তা’দের পূজোর বাজারে সন্দেশ টন্দেশ্ যা কিছু, এমনি করে উপরি লাভ।

 কথাটা মনে হবামাত্র, ছোটভাই আপনাদের সেই গাড়ীটির দিকে গেলেন। একটু দূরে থেকে দেখ‍্লেন, গাড়ীটির নিকটে কেউ নাই। দরজা খুলে দেখেন—হাঁড়িটি কে সরিয়ে ফেলেছে। গাড়ীর অপর দিক দিয়ে উঁকি মারলে দেখা গেল, এক বেটা কুলী, অল্প একটু দূরে, গায়ে কাপড় চোপড় ঢাকা দিয়ে যাচ্ছে। এত আর শীতকাল নয়, যে গায়ে কাপড় দেবার দরকার। বেশ বুঝ‍্তে পাল্লেন—কুলী বেটা সন্দেশের হাঁড়ী আপনার বাসায় রাখতে যাচ্ছে। সে যখন অনেক দূর গেছে, আর এ দিকে ষ্টীমার ছাড়বারও দেরী নাই, তখন প্ল্যাটফরমে একজন কনষ্টেবল দেখ‍্তে পেলেন। বল্লেন—“দেখো কনষ্টেবল্ হামারা একঠো মিঠাইকা হাণ্ডী ইয়ে কামরামে থা, লেকিন আবি মিল‍্তা নেই। হাম দেখা, এক কুলী ছিপাকে একঠো হাণ্ডী লেযাতা হ্যায়। হাম উস‍্কো কো দেখলানে সেক‍্তা। চলা আও হামারা সাথ।”

 এই বলে, সেইখান থেকেই সেই পলাতক কুলীকে দেখিয়ে দিলেন। কনষ্টেবল সেই লোকটার দিকে চল‍্লো, তিনি নিজে ষ্টীমারে ফিরে এলেন। ষ্টীমারও তখনই ছেড়ে দিলে।

 ছোটভাইটি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। তিনি থাকতে থাকতে চোরটা যদি পাক‍্ড়া পড়ত, তা হলে একটা গণ্ডগোল হতই— এখন সে ভয় আর কিছু রইল না।

 কথাটা কিন্তু, বড় ভাইকে লজ্জার জন্য বলতে পাল্লেন না।

 * * * 

 দৌড়ুলে পাছে চোরটা পালায়, সেজন্য কনষ্টেবল প্রভু হাঁটার মত, অথচ একটু দ্রুতপদে চল‍্তে লাগলো।—চোরটা আর পালাবে কোথায়? চোরটাও বেশ নিশ্চিন্দি হয়ে যাচ্ছিল, পথে একজন রেলের পয়েন্টম্যানের সঙ্গে দেখা হয়! হাঁড়ি নিয়ে কোথায় যাচ্ছে, জিজ্ঞাসা করাতে সে বলেছিল “এ সমান, বড়া টিকিট কালেক্টার বাবুকো ডেরামে দেনা পড়েগা। ইস‍্মে মিঠাই হ্যায়।” পয়েন্টসম্যান আর কিছু বলে নাই। এমন জিনিষপত্র বাবুদের বাড়ী গিয়ে থাকে।

 কুলী বেটা নিরুপদ্রবে আপনার বাসার দিকে চল‍্তে লাগল।

 খানিক পরে কনেষ্টবল গিয়ে, চোর বেটার হাত চেপে ধরলে। ধমক দিয়ে বল্লে—“শালে তুম বড়া হুঁসিয়ার। হাম‍্রা আঁখমে মাট‍্টী ফেঁক‍্কে চোরী কর‍্কে ভাগো গে?”

 চোর বেটার মুখে কথা নাই। কনষ্টেবল কুলীটার গায়ের কাপড় খানা টেনে নিয়ে তাকে বাঁধলে। সে একা—কি জানি বেটা যদি পালিয়ে যায়? কনষ্টেবল নিজে কখন, চোর ধরে নাই, এই তার প্রথম।

 হাঁড়িটের ভিতর কি আছে না আছে, দেখবার তত প্রয়োজন আছে বলে, কনস্টেবল প্রভু মনে কল্লেন না। চোরটা যখন
সচিত্র রেল অবতার - অনাথবন্ধু সেন (page 62 crop).jpg
সোৎসাহে কনস্টেবল হাঁড়ি খুলিল।
কিছু বল‍্লে না, তখন ত সে স্বীকারই যাচ্ছে, যে বাবুর সন্দেশের হাঁড়ি সেই নিয়েছে!

 মহা উল্লাসের সঙ্গে চোরকে নিয়ে, কন‍্ষ্টেবল প্রভু থানায় গিয়ে হাজির। তখন ইন‍্স্পেক্টার বাবু রোয়াকে বসে চুরুট খাচ্ছিলেন। কনষ্টেবল চোর ধরার কথা সমস্ত নিবেদন কর‍্লে।

 ইন‍্সপেক্টার বাবু কুলীকে তর্জ্জন গর্জন করে বল্লেন—“ইয়ে শালা, হাণ্ডি তোমারা কাঁহা মিলা?”

 চোরটা কাঁদুনীর সুরে বল্লে—“হুজুর এ হাণ্ডিঠো গাড়ীকা ভিতর কোই আদমি ছুট গিয়া থা—বহুত বখত লেনে নেই আয়া—উস ওয়াস্তে হাম উঠা লিয়া। খানেকো চিজ হ্যায় হুজুর, ইয়ে বহুত রুপেয়াকা মাল নেহি হ্যায়। হুজুর গরীবক। মা বাপ্—কসুর মাপ কিজিয়ে।”

 ইন‍্সপেক্টার হাঁড়ি খুলে, কি জিনিষ আছে দেখতে চাইলেন।

 সোৎসাহে কনষ্টেবল হাঁড়ি খুলিল, কিন্তু খুলবা মাত্র চার পা পিছিয়ে পড়ল। উচ্চৈঃস্বরে বল্লে—“বাবু সাব, মেরা জাত্ গিয়া, ইয়্যা সীতারাম! সীতারাম!”

 এই বলে কনষ্টেবল মুহুর্মুহু থুতু ফেলতে লাগল। চোর বেটাও ব্যাপার বুঝতে পেরে “সীতারাম! সীতারাম!” বলতে বলতে, নাক মুখ সিটকাতে ও থুতু ফেলতে লাগল।

 ইন‍্সপেক্টার যখন বুঝলেন—চোর বেটার ও কনষ্টেবলের কেমন কর্ম্ম ভোগ হয়েছে, তখন নিজে নিজে ভারী হাসি হেসে নিলেন। হাসি থামলে বল‍্লেন—“তুম্ বড়া বড়িঁয়া চোর— ঔর তুম্ বড়া বড়িঁয়া সিপাহী হ্যায়। তুম্ চোর হোকে নেহি দেখতা, কিয়া চিজ তুম উঠাতেহো— ঔর সিপাহী হোকে, চিজ্ নেই দেখ‍্কে, তুম্ চোরকে গ্রেপ্তার কর‍্তেহো! তুম লোক‍্কা খোদা সাজা দিয়া—আবি দরিয়ামে যাকে শুধ্ হোকে আও, ঔর মেথরকো বোলা দেও।