সময় অসময় নিঃসময়/পূর্বলেখ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

পূর্বলেখ

‘We are no longer in the era of the will, but of the passing impulse
We are no longer in the era of anomie, but of anomaly.
We are no longer in the era of the event, but of the eventuality.
We are no longer in the era of virtue, but of virtuality.
We are no longer in the era of power, but of potentiality.’

 কবিতার মতো এই উচ্চারণ জাঁ বদ্রিলার করেছিলেন ‘Cool Memories’ (১৯৯৪: ১৮) নামক বিখ্যাত জার্নালে। কীভাবে চিহ্নিত করব নিজের সময়কে, প্রতিটি যুগের মানুষ এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে বিহ্বল বোধ করেছে। কেননা জিজ্ঞাসা যেমন অন্তহীন তেমনি মীমাংসাহীন সমকালকে কি চেনা যায় সত্যিসত্যি? কবি-গল্পকার-ঔপন্যাসিক-চিত্রকর তবু সময়ের স্বর ও অন্তঃস্বর নিয়ে ভাবেন। নিজস্ব ধরনে বয়ানের টানা ও পোড়েন তৈরি করেন। কিন্তু এত উদ্যম সত্ত্বেও সময়-জিজ্ঞাসার নিরসন হয় না। বরং নতুন নতুন প্রশ্ন উসকে দেয় আপাত-সময় ও প্রকৃতসময়ের সমান্তরাল অস্তিত্ব। আর, অস্তিত্বের নতুন বোধ পরিসর-চেতনাতেও প্রতীয়মান এবং যথার্থের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংশয়-অবভাসের গ্রন্থি তৈরি করে।

  দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেলাম বিশ শতক। একুশ শতকের চৌকাঠে দাড়িয়ে বিহ্বল মানুষ দেখছে, সত্যও উৎপাদিত হয়। দেখছে, বিশ্বায়ন নামে জুজুবুড়ি ধীরে ধীরে তৃতীয় বিশ্বের প্রত্যন্ত এলাকাতেও কীভাবে সান্টাক্লজে পরিণত হয়ে গেছে। পি.সি সরকারের গিলিগিলি হোকাসপোকাস এখন কম্পিউটার নামক ময়দানব ঢের বেশি দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করছে। টুপি থেকে বেরোচ্ছে হাতি, স্পিলবার্গের ডায়নোসোর, অন্য নক্ষত্রলোক থেকে আসা মহাকাশযান। সব মায়া, সব সত্যের ইজারাদার এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার মোড়লপ্রভু। একদিকে দেশ ও জাতির সীমান্ত চূর্ণ করে দিনরাত ইথারতরঙ্গে ভেসে আসছে ছদ্মপৃথিবীর সম্মোহক মাদক, অন্যদিকে উদ্ভট কুসংস্কার আর ধর্মীয় গোঁড়ামি ভরা অপপুরাণের মরা কোটালে নতুন জোয়ার এনে দিচ্ছে কম্পিউটার প্রযুক্তি। উপগ্রহের অকৃপণ সহযোগিতায় গণমাধ্যম এখন মাদকভরা বিনোদনের অফুরন্ত যোগানদার। সাহিত্য কবেই পণ্য হয়ে গিয়েছিল। এখন তা খোলাখুলি প্রতাপের সেবাদাস, আধিপত্যবাদী রাজনীতির সুরে-তালে-লয়ে পাঠকৃতির তন্তুগুলি বাধা।

  এ সময় সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিক পিঞ্জর বিনির্মিত হচ্ছে তবু। হতেই হবে। কেননা দ্বিবাচনিকতা জীবনের নিয়ামক বিধি। সাহিত্যের পাঁজর থেকে জন্ম নিচ্ছে জীবন্ত লেখার প্রতিস্রোত। কী কবিতায় কী ছোটগল্পে কী উপন্যাসে আকরণোত্তর বিন্যাস ও উত্তরায়ণ মনস্কতা অপরিহার্য সত্য। পিঞ্জরায়িত সময়ের রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র, আবার শমীগর্ভে প্রচ্ছন্ন আগুনের মতো অপ্রাতিষ্ঠানিক সময়বোধের দ্বিবাচনিক অভিব্যক্তিও দেখতে পাচ্ছি আমরা। নইলে হাসান আজিজুল হক-আখতারুজ্জামান ইলিয়াস লিখতেন না, ইমদাদুল হক মিলন আর হুমায়ুন আহমেদেরা লিখতেন কেবল। কিংবা মহাশ্বেতা দেবী, সাধন চট্টোপাধ্যায়, স্বপ্নয়ম চক্রবর্তী, ভগীরথ মিশ্র, অমর মিত্র, কিন্নর রায়, নবারুণ ভট্টাচার্যের লিখতেন না কখনো। আজও সুবিমল মিত্র, উদয়ন ঘোষ, কাজল শাহনেওয়াজেরা লেখেন কেন যদি সময়ের প্রতীয়মান ও প্রশ্রয়ধন্য পাঠ সম্পর্কে তাদের আপত্তি না থাকত? অবভাস আমাদের চিন্তায়, চেতনায় মড়কের সংক্রামক কীটের মতো অনুপ্রবেশ করেছে। সত্য কী আমরা জানি না, এমন কী মিথ্যাকেও আমরা জানি না। আমরা ইতিহাসকে ঠোটে রাখি, মেধায় রাখি না। বরং অতি চতুর অতি সপ্রতিভ প্রতীচ্য থেকে উড়ে-আসা ইতিহাস-সন্দর্ভ-ভাবাদর্শের মৃত্যু বিষয়ক ধারণার আঁধি আমাদের আচ্ছন্ন করছে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত হাত দুটি তুলে এনে নিজের বুকের ওপর রেখে পরখ করতেও অনীহা, এখনো সেই পুরনো হৃৎপিণ্ড আগের তালে-লয়ে ধুকপুক করছে কিনা।

 সব অস্থির এখন: আবেগ-চিন্তা-অনুভূতি-বিশ্বাস। ইচ্ছার ওপর সময়ের কর্তৃত্ব নিশ্চয়, কিন্তু ব্যক্তি কি নিরুপায় ভোক্তা ও গ্রহীতা! তাৎক্ষণিক তাগিদে যদি সব কিছুই হয়, লেখার উপকরণ তাহলে কী হবে? তন্বয়ের পুরনো রীতি বাতিল হয়ে গিয়ে যদি অনন্বয়ের সঞ্চরমান অনুভূতিপুঞ্জ সর্বেসর্বা হয়ে থাকে, তাহলে ঘটমানতা বলে কিছুই থাকবে না। যদি এমন হয়, গল্পকার এবং ঔপন্যাসিক কোনো ধরনের যথাপ্রাপ্ত সম্পর্কে মাথা ঘামাবেন না আর। অবভাস কী তত্ত্ববস্তুই বা কী! দ্রুত বদলে-যাওয়া এবং বদলাতে-থাকা এ সময়ে দর্শনেরও মৃত্যু ঘোষণা তবে অবধারিত। কালঃ পচতি ইতি বার্তা।

 বাংলার মূল ভূখণ্ডের বাইরে আমরা যারা বাংলা বলি, লিখি, ভাবি, তর্ক করি—যথাপ্রাপ্ত প্রান্তিক অবস্থানের বিষণ্ণতা, বিচ্ছিন্নতা, গ্রন্থিলতা কি আমাদের সাহিত্যবোধে দুরপনেয় ছাপ ফেলেনি? আমাদের সৃষ্টি ও নির্মাণ, মেধা ও সংবিদকে কি হঠাৎ কুয়াশা এসে আচ্ছন্ন করে না? ইংরেজি ও স্পেনীয় ভাষায় যারা কথা বলেন, তাদের ভাষাচেতনা ও সাহিত্যচেতনা অবস্থান অনুযায়ী ভিন্নভিন্ন। প্রতিটি পরিসরের স্বতন্ত্র মর্যাদা নিয়ে কিন্তু কেউ প্রশ্ন তোলে না। হায়, জেলায়-জেলায় পরগণায়-পরগণায় যে বাংলা ভাষার রূপতাত্ত্বিক ও ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য অসামান্য—সেই ভাষায় যারা কথা বলেন, তাদের বাঙালিত্ব এখনো প্রমাণ-সাপেক্ষ। দেবীপ্রসাদ সিংহ, শেখর দাশ, দুলাল ঘোষদের সৃষ্টির ভুবন সম্পর্কে কোনো কৌতূহল উত্তর-পূর্ব ভারতের বাইরে আছে কি? সূর্য যেমন পাহাড়ে ও সমতলে, সমুদ্রে ও অরণ্যে সমান রোদ্র ছড়িয়ে দেয়—সময়ও তেমনি একই উত্তাপ নিয়ে আসে। কে কতখানি শুষে নিচ্ছে, তা নির্ভর করে বেশ কিছু প্রাকশর্তের ওপর। সময়ের নতুন সমিধকে কতখানি কীভাবে কারা কাজে লাগাচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে আগুন ও ধোঁয়ার অনুপাত।

 এ সময় আগুনের, এসময় ধোঁয়ারও। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অন্তঃস্বরে তার অভ্রান্ত প্রমাণ নিহিত। শুধু দেখার চোখ চাই। পাঠকৃতির অন্তর্বর্তী অন্ধবিন্দুগুলি শনাক্ত করতে হবে, শূন্যায়তনগুলিরও নিবিড় পাঠ করা চাই। কেননা কথিত বাচনে শুধু সময় ধরা পড়ে না; বরং অকথিত পরাবাচনে সময়ের ইশারাগুলি থাকে। শব্দান্তবর্তী সেইসব শূন্যতা নিয়েই সম্পূর্ণ হয় চিহ্নায়কের গ্রন্থনা। কবিতা পড়ি কিংবা ছোটগল্প অথবা উপন্যাস, এমন কী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরের সমস্যা নিয়েই ভাবি, আমাদের বিশ্লেষণ হোক দ্বি-বাচনিকতায় আধারিত; ব্যক্তিসত্তা ও সামাজিক; সত্তার সুড়ঙ্গলালিত সম্পর্ক মাঝে মাঝে আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। ওই সম্পর্ক বিচারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সময়কে বুঝি বিম্বিত পরিসরে, পরিসরকেও বুঝি সময়ের নিরিখে। এদের আন্তঃসম্পর্কে জটিলতা চিরকাল ছিল, চিরকাল থাকবে। যুগে যুগে তার পুনর্নবীকরণের ধরনটুকু পাল্টায় শুধু।

 আমাদের লেখায় বড়ো নির্জনতা এখন। হয়তো এই নির্জনতায় বিষাদ নেই তত। আছে উদ্ভট মান্যতার বোেধ; মান্যতা বলব, বৈধতা নয়। এখন আমরা প্রাজ্ঞ হতে পারি সহজে। তাই আমাদের ইদানীংকার পাঠকৃতিতে দেখতে পাই—সমস্ত কেমন যেন আপাত, ত্রিশঙ্কু, চূড়ান্তবিন্দু থেকে স্থিরীকৃত দূরত্বে রুদ্ধ। নিশ্চয় এই বোধও সময়-শাসিত। কিন্তু কীভাবে অস্বীকার করি যে আজকের লেখকেরা এবং আলোচকেরা সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যাওয়াতে পারদর্শী? গভীর গভীরতর কোনো কারণে, সম্ভবত বিশ্বায়নের ছলে সংক্রামিত নির্মানবায়নের প্রভাবে, আমাদের সমস্ত বোধই অসাড় আজ। দাতা যেখানে, গ্রহীতাও সেখানে। ভুল প্রমাণিত হতে বড়ো ভয়। প্রতিটি পাঠকৃতি যে-ধরনের প্রত্যাশা জাগিয়ে শুরু হয়, আপাত-সমাপ্তির বিন্দুতে পৌছে দেখি, প্রত্যাশাকে কৌশলে পাশ কাটিয়ে গেছে বৌদ্ধিক চাতুর্য। ব্যতিক্রম আছে, কিন্তু তা তো নিয়মকেই প্রমাণিত করে।

 তাহলে কি জাঁ বদ্রিলারের বিষাদ-মথিত উচ্চারণই মেনে নেব: ‘We are condemned to social coma, political coma, historical coma. We are condemned to an anaesthetized disappearance, to a fading away under anasesthesia.' (তদেব: ৫)। এ সময়ের কবি ও কথাকারেরা, প্রাবন্ধিক ও সাংস্কৃতিক যোদ্ধারা এই বাচনের যথার্থতা খুঁজুন তাদের সৃষ্টি ও জীবনের যুগলবন্দি পাঠকৃতিতে। কিংবা প্রতিশ্ন করুন। বাঙালির সমস্ত ভুবনে অব্যাহত থাকুক এই খোজা বা প্রতিপ্রশ্ন হয়তো পরিসর অনুযায়ী মীমাংসা ভিন্ন হবে, হয়তো কোনো মীমাংসাই হবে না, তবু।