বিষয়বস্তুতে চলুন

মহাভারত (রাজশেখর বসু)/বনপর্ব/ইন্দ্রলোকাভিগমনপর্বাধ্যায়

​

॥ইন্দ্রলোকাভিগমনপর্বাধ্যায়॥

১১। ইন্দ্রলোকে অর্জুন—উর্বশীর অভিসার

 আকাশ আলোকিত ও মেঘ বিদীর্ণ ক’রে গম্ভীরনাদে মাতলিচালিত ইন্দ্রের রথ অর্জুনের সম্মুখে উপস্থিত হ’ল। সেই রথের মধ্যে অসি শক্তি গদা প্রাস বিদ্যুৎ বজ্র, চক্রযুক্ত মেঘধ্বনির ন্যায় শব্দকারী বায়ুবিস্ফোরক গোলক-ক্ষেপণাস্ত্র [১], মহাকায় জ্বলিতমুখ সর্প, এবং রাশীকৃত বৃহৎ শিলা ছিল। বায়ুগতি দশ সহস্র অশ্ব সেই মায়াময় দিব্য রথ বহন করে। মাতলি বললেন, ইন্দ্রপুত্র, রথে ওঠ, দেবরাজ ও অন্য দেবগণ তোমাকে দেখবার জন্য প্রতীক্ষা করছেন। অর্জুন বললেন, সাধু মাতলি, তুমি আগে রথে ওঠ, অশ্বসকল স্থির হ’ক, তার পর আমি উঠব। অর্জুন গঙ্গায় স্নান করে পবিত্র হয়ে মন্ত্রজপ ও পিতৃতর্পণ করলেন, তার পর শৈলরাজ হিমালয়ের স্তব ক’রে রথে উঠলেন। সেই আশ্চর্য রথ আকাশে উঠে মানুষের অদৃশ্য লোকে এল, যেখানে চন্দ্র সূর্য বা অগ্নির আলোক নেই। পৃথিবী থেকে যে দ্যুতিমান তারকাসমূহ দেখা যায় সেসকল অতিবৃহৎ হ’লেও দূরত্বের জন্য দীপের ন্যায় ক্ষুদ্র বোধ হয়। অর্জুন সেইসকল তারকাকে স্বস্থানে স্বতেজে দীপ্তিমান দেখলেন। মাতলি বললেন, পার্থ, ভূতল থেকে যাঁদের তারকারূপে দেখেছ সেই পুণ্যবানরা এখানে স্বস্থানে অবস্থান করছেন।

 অর্জুন অমরাবতীতে এলে দেব গন্ধর্ব সিদ্ধ ও মহর্ষিগণ হৃষ্ট হয়ে তাঁর সংবর্ধনা করলেন। তিনি নতমস্তকে প্রণাম করলে ইন্দ্র তাঁকে কোলে নিয়ে নিজের সিংহাসনে বসালেন। তুম্বরু প্রভৃতি গন্ধর্বগণ গাইতে লাগলেন, ঘৃতাচী মেনকা রম্ভা উর্বশী প্রভৃতি হাবভাবময়ী মনোহারিণী অপ্সরারা নাচতে লাগলেন। তার পর দেবগণ পাদ্য অর্ঘ্য ও আচমনীয় দিয়ে অর্জুনকে ইন্দ্রের ভবনে নিয়ে গেলেন।

 ইন্দ্রের নিকট নানাবিধ অস্ত্র শিক্ষা করে অর্জুন অমরাবতীতে পাঁচ বৎসর সুখে বাস করলেন। তিনি ইন্দ্রের আদেশে গন্ধর্ব চিত্রসেনের কাছে নৃত্য-গীতবাদ্যও শিখলেন। একদিন চিত্রসেন উবর্শীর কাছে গিয়ে বললেন, কল্যাণী, দেবরাজের আদেশে তোমাকে জানাচ্ছি যে অর্জুন তোমার প্রতি আসক্ত হয়েছেন, তিনি আজ তোমার চরণে আশ্রয় নেবেন। উর্বশী নিজেকে সম্মানিত জ্ঞান ক’রে ​স্মিতমুখে বললেন, আমিও তাঁর প্রতি অনুরক্ত। সখা, তুমি যাও, আমি অর্জুনের সঙ্গে মিলিত হব।

 উর্বশী স্নান ক’রে মনোহর অলংকার ও গন্ধমাল্য ধারণ করলেন এবং সন্ধ্যাকালে চন্দ্রোদয় হ’লে অর্জুনের ভবনে যাত্রা করলেন। তাঁর কোমল কুঞ্চিত দীর্ঘ কেশপাশ পুষ্পমালায় ভূষিত, মুখচন্দ্র যেন গগনের চন্দ্রকে আহ্বান করছে, চন্দনচর্চিত হারশোভিত স্তনদ্বয় তাঁর পাদক্ষেপে লম্ফিত হচ্ছে। অল্প মদ্যপান, কামাবেশ ও বিলাসবিভ্রমের জন্য তিনি অতিশয় দর্শনীয়া হলেন। দ্বারপালের মুখে উর্বশীর আগমনসংবাদ পেয়ে অর্জুন শঙ্কিতমনে এগিয়ে এলেন এবং লজ্জায় চক্ষু আবৃত ক’রে সসম্মানে বললেন, দেবী, নতমস্তকে অভিবাদন করছি বলুন কি করতে হবে, আমি আপনার আজ্ঞাবহ ভৃত্য। অর্জুনের কথা শুনে উর্বশীর যেন চৈতন্যলোপ হ’ল। তিনি বললেন, নরশ্রেষ্ঠ চিত্রসেন আমাকে যা বলেছেন শোন। তোমার আগমনের জন্য ইন্দ্র যে আনন্দোৎসবের অনুষ্ঠান করেছিলেন তাতে দেবতা মহর্ষি রাজর্ষি প্রভৃতির সমক্ষে গন্ধর্বগণ বীণা বাজিয়েছিলেন, শ্রেষ্ঠ অপ্সরারা নৃত্য করেছিলেন। পার্থ, সেই সময়ে তুমি নাকি অনিমেষনয়নে শুধু আমাকেই দেখেছিলে। সভাভঙ্গের পর তোমার পিতা ইন্দ্র চিত্ররথকে দিয়ে আমাকে আদেশ জানালেন, আমি যেন তোমার সঙ্গে মিলিত হই। এই কারণেই আমি তোমার সেবা করতে এসেছি। তুমি আমার চিরাভিলষিত, তোমার গুণাবলীতে আকৃষ্ট হয়ে আমি অনঙ্গের বশবর্তিনী হয়েছি।

 লজ্জায় কান ঢেকে অর্জুন বললেন, ভাগ্যবতী, আপনার কথা আমার শ্রবণযোগ্য নয়, কুন্তী ও শচীর ন্যায় আপনি আমার গুরুত্নীতুল্য। আপনি পুরু বংশের জননী[২], গুরুর অপেক্ষাও গুরুতরা, সেজন্যই উৎফুল্লনয়নে আপনাকে দেখেছিলাম। উর্বশী বললেন, দেবরাজপুত্র আমাকে গুরুস্থানীয়া মনে করা অনুচিত, অপ্সরারা নিয়মাধীন নয়। পুরুবংশের পুত্র বা পৌত্র যেকেউ স্বর্গে এলে আমাদের সঙ্গে সহবাস করেন। তুমি আমার বাঞ্ছা পূর্ণ কর। অর্জুন বললেন, বরবর্ণিনী, আমি আপনার চরণে মস্তক রাখছি, আপনি আমার মাতৃবৎ পূজনীয়া, আমি আপনার পুত্রবৎ রক্ষণীয়। উর্বশী ক্রোধে অভিভূত হয়ে কাঁপতে কাঁপতে ভ্রুকুটি ক’রে বললেন, পার্থ, আমি তোমার পিতার অনুজ্ঞায় স্বয়ং তোমার গৃহে কামার্তা হয়ে এসেছি তথাপি তুমি আমাকে আদর করলে না; তুমি সম্মানহীন ​নপুংসক নর্তক হযে স্ত্রীদের মধ্যে বিচরণ করবে। এই ব’লে উর্বশী স্বগৃহে চ’লে গেলেন।

 উর্বশী শাপ দিয়েছেন শুনে ইন্দ্র স্মিতমুখে অর্জুনকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, বৎস, তোমার জন্য কুন্তী আজ সুপত্রবতী হলেন, তুমি ধৈর্যে ঋষিগণকেও পরাজিত করেছ। উর্বশীর অভিশাপ তোমার কাজে লাগবে, অজ্ঞাতবাসকালে তুমি এক বৎসর নপুংসক নর্তক হয়ে থাকবে, তার পর আবার পুরুষত্ব পাবে।

 অর্জুন নিশ্চিন্ত হয়ে চিত্রসেন গন্ধর্বের সংসর্গে সুখে স্বর্গবাস করতে লাগলেন। পাণ্ডুপুত্র অর্জুনের এই পবিত্র চরিতকথা যে নিত্য শোনে তার পাপজনক কামক্রিয়ায় প্রবৃত্তি হয় না, সে মত্ততা দম্ভ ও রাগ পরিহার ক’রে স্বর্গলোকে সুখভোগ করে।

  1. ↑ ‘চক্রযুক্তাস্তুলাগুড়াঃ বায়ুস্ফোটাঃ সনির্ঘাতা মহামেঘস্বনাঃ।’ নীলকণ্ঠ কামান অর্থ করেছেন। স্পষ্টত প্রক্ষিপ্ত।
  2. ↑ পুরুরবার ঔরসে উর্বশীর গর্ভে আয়ু জন্মগ্রহণ করেন, তাঁর প্রপৌত্র পুরু।