ব্রাহ্মধর্ম্মের মত ও বিশ্বাস

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
ব্রাহ্মধর্ম্মের মত ও বিশ্বাস

ব্রাহ্মধর্ম্মের মত

বিশ্বাস।


১৭৯১ শক।

ব্রাহ্মধর্ম্মের মত ও বিশ্বাস।


শ্রীযুক্ত প্রধান আচার্য্য মহাশয় কর্ত্তৃক

১৭৮১ । ৮২ শকে

ব্রহ্মবিদ্যালয়ে

প্রদত্ত

দশ উপদেশ।

কলিকাতা

ব্রাহ্মসমাজের যন্ত্রে মুদ্রিত।


তৃতীয় বার।

১৭৯১ শক।

উপক্রমণিকা।


 পরমেশ্বর আমাদের জ্ঞানের সমুদায় কার্য্য কেবল আমারদের বুদ্ধির হস্তে সমর্পণ করিয়া রাখেন নাই। তিনি যদি আমারদিগকে ক্ষুধা-তৃষ্ণা না দিতেন, আর আমারদের বুদ্ধি ও বিবেচনা করিয়া শরীর পোষণ করিতে হইত, তাহা হইলে আমারদের যেরূপ দুর্দশা হইত; সেই রূপ প্রত্যেক জ্ঞান-ক্রিয়া যদি কেবল আমারদের বুদ্ধির হস্তে থাকিত, তাহা হইলেও আমরা পদে পদে দুর্দ্দশা-গ্রস্ত হইতাম। যদি যুক্তি ও তর্ক এবং বুদ্ধি ও শাস্ত্রের সাহায্য ব্যতিরেকে ঈশ্বরকে জানা না যাইত—যদি সমুদায় দর্শন শাস্ত্র উদঘাটন করিয়া না দেখিলে আমাদের ধর্ম্মজ্ঞান জন্মিত; তবে পৃথিবীর অধিকাংশ লোকেই ধর্ম্ম ও ঈশ্বর হইতে বিচতি থাকিত। কিন্তু বাস্তবিক তাহা নহে; আমারদের প্রত্যক্ষ জ্ঞান যে রূপ সহজে হয়, সেই প্রকার সহজ জ্ঞান অন্যান্য বিষয়েরও হইয়া থাকে। এই প্রকার সহজ জ্ঞান আমার ও তোমারও নহে, কিন্তু ইহা সকল মনুষ্যেরই সাধারণ সম্পত্তি।

 আমরা দুই শ্রেণীর লোক সচরাচর দেখিতে পাই। কতকগুলি লোকের অতি তীক্ষ-বুদ্ধি; তাহারা তীক্ষতা সহকারে বস্তু-তত্ত্ব-সকল নির্ণয় করে, তাহারা এক বিষয়ের সকল দিক্ দেখিয়া বিচার করে, এবং অতি দুরূহ বিষয়-সকলও খণ্ড খণ্ড করিয়া স্পষ্টরূপে অবধারণ করে। অন্য কতকগুলি লোক ঠিক ইহার বিপরীত। তাহারা যদিও সুশিক্ষিত পণ্ডিতদিগের মত নিপুণ-রূপে বলিতে কহিতে পারে না, যদিও ধৈর্য্যাবলম্বন পূর্ব্বক বিচার করিতে পারে না; তথাপি তাহারদের স্বাভাবিক কেমন এক প্রকার ভাব যে তাহারদের মুখ হইতে সহজে যে সকল কথা বিনির্গত হয়, তাহা দেব-বাক্য তুল্য। যখন জন-সমাজের চতুর্দ্দিক অজ্ঞানান্ধকারে আবৃত থাকে, তখন সেই অন্ধকারের মধ্য হইতে যে এক এক প্রখর জ্যোতিষ্মান্ পুরুষ উথিত হয়েন; তাঁহাদের জ্ঞান উক্ত প্রকার সহজ জ্ঞান। তাঁহাদের অন্তর্দৃষ্টি অতি উজ্জ্বল। তাঁহারা অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া, কি বহুবিধ গ্রন্থ পাঠ করিয়া, কোন বিষয় শিক্ষা করেন না বটে; কিন্তু বহির্দৃষ্টিতে বাহিরের বিষয়-সকল যেমন সহজে উপলব্ধি হয়, তাঁহাদের অন্তর্দৃষ্টিতে সত্যের প্রতিভা তেমনি সহজে পড়ে। যে সকল সময়ে এই রূপ এক এক মহাত্মা উদিত হন, তখনকার জুন-সমাজের অবস্থা দেখিয়া আশ্চর্য্য হইতে হয়, যে এমন আন্ধকারের মধ্য হইতে এ প্রকার তেজীয়ান্ পুরুষ কোথা হইতে আইলেন। ঈসা, নানক, মহম্মদ; এই সকল লোকের এই প্রকার ভাব।

 এই প্রকার অন্তর্দৃষ্টিতে আমরা যে সকল জ্ঞান উপলব্ধি করি তাহা সহজ, সাক্ষাৎ, স্বাভাবিক; তাহা স্বতঃসিদ্ধ; তাহা মনুষ্যের সাধারণ সম্পত্তি। বাহিরের বস্তু-সকল আমরা যেমন সাক্ষাৎ দেখি, অতীন্দ্রিয় উচ্চতর বিষয়েরও আমাদের সেই রূপ সাক্ষাৎ জ্ঞান লাভ হইতে পারে। বিষয়-জ্ঞান আমারদের দুই প্রকারে উপলব্ধি হইতে পারে। হয়, আমরা কোন বস্তু চক্ষে দেখি; নয়, তাহা কোন গ্রন্থ মধ্যে বা অন্যের নিকট হইতে শিক্ষা করি। আমি যদি স্বচক্ষে এই বৃক্ষের শোভা দেখিয়া আমোদিত হই, তবে এই স্থলে আমার প্রত্যক্ষ জ্ঞান হইল। কিন্তু আমি দেখি নাই, এমন এক বৃক্ষের বিষয় যদি কেহ আমার নিকটে বর্ণন করে; তবে এ স্থলে আমার জ্ঞান সাক্ষাৎ জ্ঞান নহে তাহা পরোক্ষ জ্ঞান। আমি তাহা জানিলাম বটে; কিন্তু সে জানা সাক্ষাৎ দেখার সঙ্গে এত প্রভেদ যে তাহাতে সংশয় জন্মিলে তাহা ভঞ্জন করিবার জন্য প্রত্যক্ষ জ্ঞান আবশ্যক।

 আমরা জগতের প্রতি দৃষ্টি করিলে যে কেবল জড়ীয় গুণ সকল উপলব্ধি করি, তাহা নহে। শিশুর মন, যখন সে কথা কহিতেও শিক্ষা করে নাই, তখন তাহাকে নানা প্রকার ভাবে আকৃষ্ট হইতে দেখা যায়। প্রথমে সে যে কেবল আকৃতি, বিস্তৃতি, বর্ণ, এই সকল দেখিতে পায়, তাহা নহে; কিন্তু নূতন নূতন বস্তুর শোভা দেখিয়াও আশ্চর্য ও আমোদিত হইতে থাকে। বিশ্বরাজ্য, শ্রী ও সৌন্দর্য্যে এ প্রকার বিভূষিত যে তাহাতে আমারদের দৃষ্টি পড়িবামাত্র আমারদের মন সৌন্দর্য্য রসে আর্দ্র হয়। সুন্দর বস্তু দেখিবা মাত্র আমরা সহজ জ্ঞানে তাহার সৌন্দর্য্য গ্রহণ করি। আমরা যখনি কোন সুরম্য পুষ্প, বা স্পৃহণীয় চন্দ্রমা, বা তারকা-সঙ্ক‌ুল-গগনের প্রতি দৃষ্টি করি; তখন আমরা কি দেখি? তাহাদের আকৃতি বিস্তৃতি প্রভৃতি যে তাহাদের জড়ীয় গুণ, কেবল তাহা দেখি না; তাহা আপেক্ষাও অধিক দেখি। সেই সকল জড় পিণ্ডের মধ্যে আমরা শোভা দর্শন করি। এই শোভার জ্ঞান আমারদের পরোক্ষ জ্ঞান নহে, তাহা প্রত্যক্ষ জ্ঞান; কিন্তু যখনি আমি সেই শোভা অন্যের নিকটে ব্যক্ত করি, অথবা তাহা দেখিবার পরে পুনর্ব্বার তাহা ভাবিতে যাই। ভামনি বুদ্ধি আসিয়া তাহার উপরে কার্য্য করিতে থাকে। সঙ্গীতের বিষয়েও এই রূপ। প্রথমে আমরা সহজ-জ্ঞান দ্বারা সঙ্গীত-রস গ্রহণ করি, তাহা যদি না পারিতাম। তবে সঙ্গীতের ব্যাকরণ বুঝাইয়া, সমুদায় সঙ্গীত-সূত্র নির্ব্বাচন করিয়াও কেহ আমারদিগকে সঙ্গীতের ভাব বুঝাইয়া দিতে পারিত না। কিন্তু আমি সঙ্গীত রসজ্ঞ হইয়া যদি সঙ্গীতের এক ব্যাকরণ রচনা করি, তবে সে স্কুলে তাহা বুদ্ধির হস্ত দিয়া বাহির হইল। শোভার জ্ঞান সঙ্গীতের ভাব, আমরা এমন সহজে পাই, যে শোভা দেখা, সঙ্গীত রস পান করা, ভাষায় এই সকল বাক্যই প্রচলিত হইয়াছে।

 ধর্ম্ম এবং ঈশ্বরের বিষয়েও এই রূপ। আমাদের স্বাভবিক ধর্ম্ম-জ্ঞান প্রত্যক্ষ জ্ঞানের ন্যায় অতি সহজ। আমরা স্বাভাবিক ধর্ম্ম-বুদ্ধি হইতে যে সকল বিষয় দেখিতে পাই, তাহা আর ছায়ার ন্যায় দেখি না, কিন্তু প্রত্যক্ষবৎ দেখি—কর্ত্তব্য, ন্যায়, সত্য, এ সকল কল্পনা মাত্র বোধ হয় না, কিন্তু এ সকলকে সার বোধ হয়—ঈশ্বর, পরকাল, এ সক।লের প্রতি বাহ্য বস্তুর ন্যায় আর কোন সংশয় থাকে না। কিন্তু আমি যদি কেবল ধর্ম্ম-শাস্ত্র হইতে ধর্ম্ম শিক্ষা করি— যদিও ঈশ্বর, পরকাল; পাপ পুণ্য; উপকার, অনিট; এই সকল শব্দ আমার মুখগ্রে থাকে; তথাপি হয় তো সে শিক্ষা কেবল মুখেই থাকে—সে ধর্ম্ম-জ্ঞান জীব-শূন্য নিষ্ফল হইয়া থাকে। যে পর্য্যন্ত না সেই শিক্ষিত বিষয়-সকল আমার জ্ঞাননেত্রের সন্মুখে আইসে—যে পর্য্যন্ত না আমি স্বয়ং পরীক্ষা করিয়া সেই সকল বিষয় দেখিতে পাই, সে পর্য্যন্ত সে শিক্ষা কোন কার্য্যেরই নহে। এই হেতু এক সামান্য কৃষকের মুখ হইতে যে সকল ধর্ম্ম-নীতি বহির্গত হয়, তাহাতে এক মহা অধ্যাপকেরও প্রকৃষ্ট রূপে শিক্ষা হইতে পারে। এ স্থলে পণ্ডিত আর মুখ উভয়েরই সমান অধিকার। ঈশ্বরকেও আমরা জ্ঞান-নেত্রে প্রত্যক্ষ, উপলব্ধি করি। আমরা যদি কেরল যুক্তির সোপান দিয়া ঈশ্বরে যাই, তবে আমরা শূন্য ঈশ্বর মাত্র পাই। কেবল বুদ্ধির অলোক এ স্থলে অন্ধকার তুল্য। ঈশ্বরের অস্তিত্ব যতক্ষণ না আমরা তর্ক দ্বারা সিদ্ধান্ত করিতে পারি, ততক্ষণ যে আমরা ঈশ্বরকে জানিতে পারি না; এ কোন কায্যেরই কথা নহে। জগৎ, আমি, ঈশ্বর, এ তিনেরই সত্তা আমাদের আত্ম-প্রত্যয়-সিদ্ধ; তাহা সিদ্ধান্ত সাপেক্ষ নহে, এবং সে সকলকে যুক্তি দ্বারা সংস্থাপন করিতেও পারা ঘায় না। আমরা কি জগতের অস্তিত্ব তর্ক দ্বারা সিদ্ধান্ত করিয়া পরে তাহা প্রত্যয় করি? যদিও সহস্র সহস্র প্রখর বুদ্ধি একত্র হইয়া বহুতর যুক্তি প্রদর্শন পূর্ব্বক জগতের অস্তিত্ব খণ্ডন করিয়াছে; তথাপি কোন্ উন্মাদ এমন আছে, যে বাহ্য বস্তুর অস্তিত্বের প্রতি সংশয় করে। বিপক্ষের শত সহস্র যুক্তি ও তর্ক এ স্থলে পরাভব পায়। ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণও সেই রূপ তর্ক তরঙ্গের উপর নির্ভর করে না। আমি যখন তাঁহাকে জ্ঞান-নেত্রে প্রত্যক্ষ প্রতীতি করি; তখন আর আমি ছায়া দেখি না, তখন করতল-ন্যস্ত আমলকের ন্যায় তাঁহার সত্তা স্পষ্ট রূপে উপলব্ধি করি—তখন “ভিদ্যতে হৃদয় গ্রন্থি শ্চিদ্যন্তে সর্ব্বসংশয়ঃ” হৃদয়ের গ্রন্থি ভিদ্যমান হয়, সকল সংশয় নিরাকৃত হয়। এই স্বাভাবিক সহজ-জ্ঞান ব্যতীত কোন সত্যই আমাদের প্রত্যক্ষ গোচর হয় না। কোন প্রকার ব্যাখ্যাতে কেহ জন্মান্ধকে বর্ণ বুঝাইয়া দিতে পারে না— কোন বর্ণনাতেই আমরা মিষ্ট, কি কটু, কি কোন প্রকার আস্বাদন উপলব্ধি করিতে পারি না। মহত্তর উচ্চতর আধ্যাত্মিক বিষয়-সকলও আমাদের পক্ষে এই রূপ।

 এই সহজ-জ্ঞান আর বুদ্ধি, এ দুয়ের স্বরূপ বিস্তর ভিন্ন। সহজ-জ্ঞানে আমরা বিষয় পাই, বুদ্ধি সেই সকল বিষয়, লইয়া নির্ম্মাণ করে। বিস্তৃতি আর সংখ্যার জ্ঞান আমরা সহজে উপলব্ধি করি, বুদ্ধি তাহা লইয়া গণিত শাস্ত্র নির্ম্মাণ করে; কর্ত্তব্যাকর্ত্তব্য জ্ঞান সহজে লাভ করি, বুদ্ধি তাহার উপরে নীতি-শাস্ত্র নির্ম্মণ করে। ঈশ্বর, পরকাল, সহজ-জ্ঞানে গ্রহণ করি, বুদ্ধি তাহাতে ধর্ম্ম-শাস্ত্র রচনা করে। এই সকল বিষয় না পাইলে বুদ্ধি কিসের উপর নির্মাণ করিবে। শুদ্ধ উপকরণ থাকিলেও একটী গৃহ নির্ম্মাণ হয় না; উপকরণ না থাকিলে কেবল নির্ম্মাতার বুদ্ধিতেও গৃহ নির্মাণ হইতে পারে না। জ্ঞান-নেত্রে আমরা শোভা দেখিতে পাই; বুদ্ধিতে শোভার প্রকার ও স্বরূপ ও তাহার তারতম্য এই সকল বিষয় বিবেচনা করি। ধর্ম্মের নিয়ম ও ব্যবস্থা—তাহার অনুষ্ঠানের ফল, এই সকল বিষয় লইয়া বুদ্ধি আলোচনা করে; কিন্তু ন্যায়, মঙ্গল, সত্য, এ সকলের আভা প্রথমে আমারদের অন্তদৃর্ষ্টিতেই পতিত হয়। ঈশ্বরের মহান্ ওরমণীয় ভাব-সকল প্রথমে আমরা সহজে উপলব্ধি করি, পরে তাহা বুদ্ধি দ্বারা বিশেষ করিয়া ব্যাখ্যা করি। এই দুই প্রকার করিয়া আমরা সকল জ্ঞান উপলব্ধি করিতেছি—সকল তত্ত্ব উদ্ঘট করিতেছি। প্রথমেই আমরা অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা সত্যকে দেখিতে পাই—পরে সেই সকল সত্যকে বিভাগ করা, শ্রেণীবদ্ধ করা তাহারদের মধ্যে প্রভেদ নির্দ্দেশ করা, এ সকল আমারদের বুদ্ধির কার্য্য।

 অমারদের জ্ঞানের ভাব এই প্রকার করিয়া দিয়া ঈশ্বর কি উদার করুণা ও নিপুণ কৌশল প্রকাশ করিয়াছেন। যদি বুদ্ধির বিকাশ না হইলে আমারদের নিকটে প্রাণ হইতেও প্রয়োজনীয় সত্যসকল অপ্রকাশিত থাকিত; তবে যাহারা আপনাদের বুদ্ধি মার্জিত করিবার অবকাশই পায় না, তাহারদের কি দুর্দ্দশা হুইত। কিন্তু বস্তুতঃ হা নহে। জগদীশ্বর কতগুলি লোককে বাছিয়া কেবল তাহারদের উপরেই সকল করুণা বর্ষণ করেন নাই, কিন্তু তাঁহার অজস্র দান সকল পুত্রেরই জন্য। মূর্খ ও পণ্ডিত কৃষক ও শিল্পী, সকলেরই নিকটে আপনাকে প্রকাশ করিতেছেন। কুটীর-বাসী দীন ব্যক্তি তাহার পরিবারের মধ্যে থাকিয়া যেমন সুনির্ম্মল ধর্ম ও অকপট সত্যকে আশ্রয় করিতে পারে, জ্ঞানী ব্যক্তিও সেই প্রকার। এক সামান্য ব্যক্তি ঈশ্বরের মঙ্গল-স্বরূপে অটল নিষ্ঠা রাখিয়া রাশি রাশি বিপদের মধ্যে যেমন অনায়াসে চলিয়া যাইতে পারে, একজন বিদ্বান্ ধার্ম্মিকও সেই প্রকার। সকল মনুষ্যই এক পিতার পুত্র—মানব জাতিই এক শরীর। সকলের উপরে সকলের নির্ভর করিতেছে। এক ব্যক্তি, এক পরিবার, এক জাতি-ইহার কিছুই সমগ্র নহে। কিন্তু সকল মনুষ্যই এক জাতি—এক পরিবার। জ্ঞানের উন্নতি, মনের প্রাশস্ত্য, ধর্ম্মের বিস্তৃতি, এ সকল এক জন কি এক জাতির উপরে নির্ভর করিতেছে, এমত নহে; কিন্তু সকল মনুষ্য মিলিত হইয়া ঈশ্বরের এই সকল মহান্ উদ্দেশ্য সিদ্ধা করিতেছে।

 এই স্বাভাবিক সাধারণ সহজ-জ্ঞানের উপরেই ব্রাহ্ম ধর্ম্ম স্থাপিত হইয়াছে, বালু-রাশির উপরে ইহার পত্তন হয় নাই। ব্রাহ্মধর্ম্মের সত্য-সকল আত্মপ্রত্যয়-সিদ্ধ; সেই সকল সত্যের আলোক মনুষ্যের অন্তর্দৃষ্টিতেই পতিত হয়। শ্রুতি, স্মৃতি, পুরাণ, তন্ত্র উৎপত্তির পূর্ব্বে ও ব্রাহ্মধর্ম্ম ছিল; এবং এ সকল যদি একেবারে ধ্বংস হয়, তথাপি তাহা থাকিবে। বেদ, কোরাণ প্রভৃতি গ্রন্থ বিশেষে বা ঈসা মুসা প্রভৃতি ব্যক্তি বিশেষে ব্রাহ্মধর্ম্ম আবদ্ধ নহে। যে সকল সত্য বুদ্ধির হস্তে পতিত হইয়া বিকৃত হয় নাই, যে সকল সত্য গ্রন্থ মধ্যে নিহিত হইয়া বিবর্ণ হয় নাই, যে সকল সত্য এক মত কি এক সম্প্রদায় কি এক জাতির মধ্যে বদ্ধ নহে; তাহাই ব্রাহ্মধর্মের অন্তর্গত। সকল ধর্মের মধ্য হইতেই ব্রাহ্মধর্মের নৈসর্গিক সৌন্দর্য প্রকাশ পাইতেছে। যে ধর্ম্ম অস্থায়ী, সঙ্কীর্ণ, পরিবর্তসহ, তাহা ব্রাহ্মধর্ম্ম নহে; আর যাহা স্থায়ী, সাধারণ, অপরিবর্তনীয়, দেশ কালে অপরিচ্ছিন্ন; তাহাই ব্রাহ্মধর্ম। ব্রাহ্ম ধর্ম ইউরোপ কি ভারতবর্য কি বঙ্গ দেশের ধর্ম নহে, কিন্তু সকল দেশের উপরেই তাহার সমান অধিকার। ব্রাহ্মধর্ম অবস্থারও দাস নহে, ঘটনারও অধীন নহে; কিন্তু সকল কালেই তাহার সমান আধিপত্য।

 এই বিশুদ্ধ ব্রাহ্মধর্ম্মের সহজ ভাব-সকল বুদ্ধির দ্বারা আলোচনা করিয়া কলিকাত ব্রহ্ম-বিদ্যালয়ে আমার পরম পূজনীয় পিতা মহাশয় যে সকল উপদেশ প্রদান করিয়া। ছেন, তাহা সাধারণের উপকারের জন্য গ্রন্থ-বদ্ধ করিয়া আমি প্রকাশ করিতেছি; ইহাতে যদি একটী আত্মাও ধর্মের সহায়ে উন্নতি লাভ করে এবং ঈশ্বর-ভাবে পূর্ণ হয়, তবে আমি কৃতার্থ হইব।

 শ্রীসত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

কলিকাতা।
৭ চৈত্র
১৭৮৩ শক।

এই লেখাটি ১ জানুয়ারি ১৯২৭ সালের পূর্বে প্রকাশিত এবং বিশ্বব্যাপী পাবলিক ডোমেইনের অন্তর্ভুক্ত, কারণ উক্ত লেখকের মৃত্যুর পর কমপক্ষে ১০০ বছর অতিবাহিত হয়েছে অথবা লেখাটি ১০০ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছে ।